8.8 C
London
October 25, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ভয়াবহ কারা কেলেঙ্কারিঃ নারী কয়েদির সঙ্গে গোপন সম্পর্ক

যুক্তরাজ্যে কারাগারের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাবেক নারী কয়েদির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ৪৭ বছর বয়সী ড্যানিয়েল হে চেশায়ারের এইচএমপি স্টায়াল নারী কারাগারে কর্মরত অবস্থায় ২৮ বছর বয়সী কয়েদি সোফি স্টোনহিউয়ারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরে ওই নারী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে নিয়ে হোটেলে যান হে। ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়।

চেস্টার ক্রাউন কোর্টে শুনানিতে বলা হয়, স্টোনহিউয়ার কারাগারে থাকাকালে হের সঙ্গে রসিকতা করে বলেছিলেন, তিনি যৌনকর্মী এবং মুক্তির পর তাকে ‘মেটস রেটস’ দেবেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাড়তে থাকে। মুক্তির তারিখ ঘনিয়ে এলে হে তাকে কারাগারের বাইরে কয়েক দিন ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং তার মোবাইল নম্বর নেন।

২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল স্টোনহিউয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের যোগাযোগ শুরু হয়। আদালতে বলা হয়, ওই নারীকে তার লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত আবাসনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু সে শর্ত না মেনে হের সঙ্গে একটি প্রিমিয়ার ইন হোটেলে যান তিনি। সেখানে তারা মদ্যপান করেন এবং পরবর্তীতে যৌন সম্পর্কে জড়ান।

এরপর ৬ এপ্রিলও তারা একইভাবে একসঙ্গে সময় কাটান। ততক্ষণে দুজনেই জানতেন যে স্টোনহিউয়ার নির্ধারিত আবাসনে না থেকে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করছেন এবং এর ফলে তাকে গ্রেপ্তার করে আবার কারাগারে পাঠানো হতে পারে।

আদালতে আরও জানানো হয়, হে ওই নারীকে মদ কিনে দেন এবং পোশাক কেনার জন্য ১০০ পাউন্ড নগদ অর্থ দেন। পরে তাদের মধ্যে ঝগড়া হলে স্টোনহিউয়ার অন্য একটি হোটেলে যাওয়ার কথা বলেন। হে সেই কক্ষের অর্থ দেওয়ার পর সেখান থেকে চলে যান। এরপর তাদের আর দেখা হয়নি বলে আদালতে জানানো হয়।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে চার দিন পর। স্টোনহিউয়ার প্রোবেশন কর্মকর্তার কাছে পুরো বিষয়টি জানান। এরপর হেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে তিনি দাবি করেন, স্টোনহিউয়ারকে তিনি শুধু সামান্য পরিচিত হিসেবে জানতেন এবং ওই সময় বন্ধুদের সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন করছিলেন। পরে তিনি সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন।

হে আরও দাবি করেন, হোটেলে মদ্যপানের পর স্টোনহিউয়ার তাকে আক্রমণ করেছিলেন এবং তাদের সাক্ষাতের ছবি ব্যবহার করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আদালতে তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল দায়িত্বশীল সরকারি পদে থাকা অবস্থায় অসদাচরণ করা।

প্রসিকিউটর জন উইন উইলিয়ামস আদালতকে বলেন, স্টোনহিউয়ার ছিলেন একজন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নারী, যার জীবন ছিল অস্থির এবং যিনি অতীতে বারবার পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। হে তার পুরো ব্যক্তিগত ইতিহাস না জানলেও তিনি জানতেন যে ওই নারী একাধিকবার কারাগারে ছিলেন।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডেতে হে কারাগারের ভেতরে স্টোনহিউয়ারকে দায়িত্ব পালন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত কথাবার্তা হয়। পরবর্তী সময়ে কারাগার চত্বরেও তাদের একাধিকবার দেখা হয় এবং সেখান থেকেই সম্পর্কটি আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

আদালতে আরও উঠে আসে, স্টোনহিউয়ার ২০১৭ সালে যৌনজীবন নিয়ে বিরোধের পর এক প্রেমিকের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন।

ড্যানিয়েল হের আইনজীবী ক্যাথরিন এলভিন আদালতে বলেন, এটি ছিল দুর্বল বিচারবোধ ও বেপরোয়া আচরণের ফল। তার দাবি, সম্পর্কটি সম্মতিপূর্ণ ছিল এবং কারাগারে থাকা অবস্থায় তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। ঘটনার সময় হে ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং দীর্ঘদিনের সঙ্গীর সঙ্গে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় ছিলেন বলেও আদালতকে জানানো হয়।

আদালতে আরও জানা যায়, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো ও সম্পত্তির ক্ষতিসহ পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও হে কারাগারে চাকরি পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে এই ঘটনায় তার চাকরি চলে যায়। বর্তমানে তিনি এইচজিভি চালক হিসেবে কাজ করছেন বলে আদালতে জানানো হয়েছে।

ড্যানিয়েল হে সরকারি পদে অসদাচরণের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। চেস্টার ক্রাউন কোর্ট তাকে ১২ মাসের কারাদণ্ড দেয়, তবে সেই সাজা ২৪ মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে ২০০ ঘণ্টা অবৈতনিক কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক স্টিভেন এভারেট হের আচরণের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, হে একজন কয়েদির সঙ্গে প্রলোভনে পড়ে ফ্লার্ট করেছিলেন এবং কারাগারের বাইরে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক তৈরি হয়। বিচারকের ভাষায়, হে ছিলেন একজন কারা কর্মকর্তা এবং স্টোনহিউয়ার ছিলেন একজন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নারী।

ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের কারাগারে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের পেশাগত সীমারেখা, বন্দিদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ক্ষমতার অবস্থান থেকে তৈরি হওয়া ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণেও দায়িত্বশীল কারা কর্মকর্তার জন্য এমন সম্পর্ক কতটা গুরুতর পেশাগত বিচ্যুতি হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

যুক্তরাজ্যে £১৮ মিলিয়নের কোকেন চোরাচালান মামলাঃ চারজনের সাজা, গ্যাং ধরতে সতর্কতা জারি

যুক্তরাজ্যে অবৈধ বন উজাড় ঠেকাতে কঠোর আইনঃ কফি-চকলেটসহ নিত্যপণ্যে আসছে নতুন নজরদারি