যুক্তরাজ্যের কেয়ার খাত নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে সম্ভাব্য ভিসা নীতির পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। খাত সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল এই সেক্টরে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে সেবার মান ও ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বেডফোর্ডশায়ারভিত্তিক কেয়ার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একজন পরিচালক আন্দ্রেয়া থাসান জানিয়েছেন, অভিবাসন নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন ইতোমধ্যেই বিদেশি কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে। তার মতে, ২০২৫ সাল থেকে কেয়ার হোম ও এজেন্সিগুলো বিদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ করতে না পারায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এছাড়া সরকার স্থায়ী বসবাসের (আইএলআর) জন্য প্রয়োজনীয় কাজের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বা ১৫ বছর করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে পরামর্শ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
থাসান বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে ১৫০ জন কর্মীর মধ্যে ৫৩ জনই বিদেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা নবায়নে বিলম্ব ও প্রত্যাখ্যানের কারণে কর্মী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক ১০টি ভিসা আবেদনের মধ্যে মাত্র ৫টি অনুমোদন পেয়েছে।
ব্যয়ের দিক থেকেও চাপ বাড়ছে। কয়েক বছর আগে যেখানে তিন বছরের ভিসার খরচ ছিল প্রায় ৩,১০০ পাউন্ড, এখন তা বেড়ে প্রায় ৪,৫০০ পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে। স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা ১৫ বছরে উন্নীত হলে প্রতি কর্মীর পেছনে স্পনসরশিপ খরচ ২২,৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
তার মতে, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে কেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে এজেন্সি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা সেবার ধারাবাহিকতা নষ্ট করবে। একই সঙ্গে কর্মী সংকটের কারণে হাসপাতালের বেড আটকে থাকার ঝুঁকি বাড়বে এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।
সরকার বিদেশি কর্মীদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ১২.৮২ পাউন্ড ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছে, যা স্থানীয় কর্মীদের ন্যূনতম মজুরির চেয়েও বেশি। এর লক্ষ্য স্থানীয়দের এই খাতে আকৃষ্ট করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে দাবি খাত সংশ্লিষ্টদের। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্মীদের কাছ থেকে কোনো আবেদনই পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে বিদেশি কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। নাইজেরিয়া থেকে আসা কেয়ার কর্মী এসথার আকিনপেলু বলেন, সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বর্তমান নিয়মে তিনি শিগগিরই স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারবেন, তবে নিয়ম পরিবর্তন হলে তিনি ও তার পরিবার অন্য দেশে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
আরেক কর্মী জ্যানেট বলেন, কাজের সময়সীমা বাড়ানো হলে তারা নিজেদের “অস্থায়ী শ্রমিক” হিসেবে মনে করেন এবং সমাজে অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি হারান। তার ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের সম্ভাব্য সময় ২০২৮ থেকে পিছিয়ে ২০৩৮ পর্যন্ত চলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের নীতিগত পরিবর্তন কেয়ার খাতে কর্মীদের দীর্ঘ সময় একই পেশায় আটকে রাখবে। কর্মভিসাধারীরা সাধারণত নিয়োগকর্তার সঙ্গে আবদ্ধ থাকায় পেশা পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত থাকে, যেখানে স্থায়ী বাসিন্দারা সহজেই অন্য খাতে যেতে পারেন।
এদিকে কেয়ার খাতে কর্মরতদের মতে, আশ্রয় ও অভিবাসন ইস্যু নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক বৈধ অভিবাসীদের প্রতিও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করার পেছনে অপব্যবহার ও শোষণের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মী বাড়াতে নতুন উচ্চ ন্যূনতম মজুরি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এই খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এ বিষয়ে মতভেদ স্পষ্ট। কেউ সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে, কেউ আরও কঠোর অবস্থান চাইছে, আবার কেউ বর্তমান নিয়ম বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেয়ার খাতের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। তবে বাস্তবতা হচ্ছে—বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল এই খাতে নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে সরাসরি সেবাগ্রহীতাদের ওপরই।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

