ব্রিটেনের নটিংহ্যাম শহরের সিটি সেন্টারে মুখ ঢাকার ওপর নতুন বিধিনিষেধ আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হচ্ছে। অপরাধ, অসামাজিক আচরণ কিংবা ভয় দেখানোর সঙ্গে পরিচয় গোপন করতে মুখের আবরণ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে পুলিশ বা অনুমোদিত কর্মকর্তা যুক্তিসংগতভাবে মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মুখের আবরণ খুলে ফেলতে বলা যাবে। নির্দেশ অমান্য করলে ৭০ পাউন্ডের ঘটনাস্থলীয় জরিমানা হতে পারে।
নটিংহ্যামশায়ার পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থাটি মূলত বালাক্লাভা, মুখোশসহ এ ধরনের আবরণ ব্যবহার করে অপরাধ বা অসামাজিক আচরণে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে চালু করা হচ্ছে। পুলিশের হাতে মুখের আবরণ জব্দ করা এবং কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘ইমিডিয়েট জাস্টিস’ কর্মসূচিতেও পাঠানোর ক্ষমতা থাকবে।
তবে এটি সবার জন্য মুখ ঢাকার ওপর blanket ban বা সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা নয়। ধর্মীয়, স্বাস্থ্যগত, চিকিৎসা, কাজ কিংবা অন্যান্য বৈধ কারণে মুখ ঢাকার ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। কোনো ব্যক্তি বৈধ কারণে মুখ ঢেকেছেন কি না, পরিস্থিতি বিবেচনায় তা নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নতুন বিধিনিষেধটি নটিংহ্যাম শহরের পাবলিক স্পেসেস প্রোটেকশন অর্ডার (পিএসপিও)-এর অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। অপরাধ বা অসামাজিক আচরণের সঙ্গে মুখের আবরণ ব্যবহারের সম্পর্ক থাকলে কিংবা সেটি অন্যদের ভয় দেখানো, হয়রানি, আতঙ্ক বা মানসিক চাপ সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে হলে কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে শহরের বাসিন্দাদের উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নটিংহ্যাম সিটি কাউন্সিলের পরামর্শ প্রক্রিয়ায় ২ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ অংশ নেন এবং ৯০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা প্রস্তাবটির পক্ষে ছিলেন বলে দ্য সান জানিয়েছে।
পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্যেও মুখ ঢাকার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ঘটনার বিষয়টি উঠে এসেছে। নটিংহ্যামশায়ার পুলিশের হিসাবে, জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত শহরের কেন্দ্রে মুখের আবরণ বা বালাক্লাভা-সংক্রান্ত ১৮০টির বেশি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘটেছে ওল্ড মার্কেট স্কয়ার, ক্লাম্বার স্ট্রিট এবং ভিক্টোরিয়া সেন্টারের আশপাশে।
পুলিশ বলছে, নতুন বিধিনিষেধের লক্ষ্য মূলত শহরের কেন্দ্রে অপরাধ ও অসামাজিক আচরণ ঠেকানো এবং পরিচয় গোপন করে অপরাধ করার সুযোগ কমানো। নটিংহ্যামশায়ার পুলিশের সিটি কমান্ডার সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিস পিয়ারসনের মতে, বালাক্লাভা ব্যবহার করে মানুষকে ভয় দেখানো বা অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে এবার আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
নিয়ম ভঙ্গ করলে প্রাথমিকভাবে ৭০ পাউন্ডের ফিক্সড পেনাল্টি নোটিশ দেওয়া হতে পারে। তবে বিষয়টি আদালতে গেলে সর্বোচ্চ ১ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। নিয়ম অমান্য অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গুরুতর বা বারবার নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে ‘ক্রিমিনাল বিহেভিয়ার অর্ডার’ জারি হতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এমনকি অনির্দিষ্টকাল নটিংহ্যাম শহরের কেন্দ্র থেকে নিষিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নটিংহ্যাম সিটি কাউন্সিলের নেতা নেগাত খান বলেছেন, বাসিন্দাদের শহরে বসবাস, কাজ ও চলাচলের সময় নিরাপদ বোধ করার অধিকার রয়েছে। তার মতে, এই ব্যবস্থা মানুষের পোশাক নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নয়; বরং অপরাধ, অসামাজিক আচরণ কিংবা অন্যকে ভয় দেখানোর কাজে মুখ ঢাকার ব্যবহার ঠেকানোই এর লক্ষ্য।
এদিকে, রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজ প্রকাশ্যে মুখ ঢাকার ওপর আরও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জনজীবনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে নিজেদের পরিচয় দৃশ্যমান রাখা উচিত। তার মন্তব্যের পর নটিংহ্যামের সিদ্ধান্তকে ঘিরে ব্রিটেনে মুখ ঢাকার ব্যবহার, জননিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তবে নতুন বিধিনিষেধ নিয়ে কিছু আইনি ও সমতার প্রশ্নও উঠেছে। নটিংহ্যাম সিটি কাউন্সিলের আগের পরামর্শ নথিতে সতর্ক করা হয়েছিল, এই ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তরুণ এবং কিছু জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর অসম প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই প্রয়োগের ক্ষেত্রে আনুপাতিকতা ও বৈষম্যহীনতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
নটিংহ্যামে এই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় শহরের কেন্দ্রজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের অন্যান্য ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। ‘অপারেশন রিক্লেইম’-এর আওতায় যুবকদের অসামাজিক আচরণ, অবৈধ ই-বাইক, মাদক বিক্রি, অস্ত্র বহন ও দোকানকেন্দ্রিক অপরাধসহ বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় পুলিশ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কাজ করছে। পুলিশের দাবি, এই অভিযান শুরুর পর শহরের কেন্দ্রে অসামাজিক আচরণ ৪২ শতাংশ কমেছে।
ফলে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নটিংহ্যামের সিটি সেন্টারে মুখ ঢাকার ব্যবহার নিয়ে পুলিশের ক্ষমতা আরও বাড়ছে। তবে বৈধ কারণে মুখ ঢেকে রাখা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ছাড় বহাল থাকবে। মূল লক্ষ্য থাকবে—অপরাধ বা অসামাজিক আচরণের সঙ্গে পরিচয় গোপনের উদ্দেশ্যে মুখ ঢাকার ব্যবহার বন্ধ করা এবং শহরের জননিরাপত্তা জোরদার করা।
সূত্রঃ দ্য সান
এম.কে

