ব্রিটেনের অভিবাসন নীতিতে আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ক্ষমতাসীন লেবার সরকার দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাস (Indefinite Leave to Remain-ILR) পাওয়ার পথ উল্লেখযোগ্যভাবে কঠিন হয়ে যাবে। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযান চালিয়ে বহিষ্কার ও আটক কার্যক্রমেও রেকর্ড গড়েছে সরকার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতায় আসার পর দুই বছরেরও কম সময়ে প্রায় ৫৮ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে আটক অথবা বহিষ্কার করেছে লেবার সরকার। এ সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। ব্রিটিশ সরকার বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, মানবপাচার চক্র দমন এবং অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরকারের কঠোর অবস্থান সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত অভিবাসীদের মধ্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের আমলে কেয়ার সেক্টরে ব্যাপক কর্মী সংকট দেখা দিলে হাজার হাজার বাংলাদেশি কেয়ার ওয়ার্কার ভিসায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন। এ সময় দালাল ও রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে অনেকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে ব্রিটেনে যান।
কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়, অনেক স্পন্সর কোম্পানির কাছে পর্যাপ্ত কাজ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রতিশ্রুত কর্মঘণ্টা দিতে ব্যর্থ হয়। কেউ কেউ আবার স্পন্সরশিপ হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন। ফলে বহু বাংলাদেশি অভিবাসী বর্তমানে অনিয়মিত কাজ, সীমিত আয়ের চাকরি কিংবা একাধিক পার্ট-টাইম কাজ করে কোনোভাবে ভিসার শর্ত পূরণ করার চেষ্টা করছেন।
অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা বৃদ্ধি। বর্তমানে অধিকাংশ ওয়ার্ক ভিসাধারী পাঁচ বছর পূর্ণ করলে ILR-এর জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে নতুন প্রস্তাবে এই সময়সীমা ১০ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা চলছে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ২০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষার বিধানও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাজ্যের একজন অভিবাসন আইনজীবী বলেন, “হাজার হাজার মানুষ পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। হঠাৎ নিয়ম পরিবর্তন হলে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিবার পুনর্মিলন এবং আর্থিক বিনিয়োগের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।”
শুধু কর্মভিত্তিক ভিসাই নয়, ছাত্র ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও কঠোরতা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য ডিপেনডেন্ট বা পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ছাত্র ভিসা থেকে দীর্ঘমেয়াদে ব্রিটেনে স্থায়ী হওয়ার পথও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গ্র্যাজুয়েট রুট এবং পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসা নিয়েও ভবিষ্যতে আরও কঠোর শর্ত আরোপের আলোচনা চলছে।
এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভিসা নীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মিয়ানমার, সুদান, আফগানিস্তান এবং ক্যামেরুনসহ কয়েকটি দেশের আবেদনকারীদের ওপর অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই ও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের দাবি, প্রকাশ্যে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বাংলাদেশ থেকে আসা আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও বর্তমানে কঠোর মূল্যায়ন চলছে।
তাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে জমা দেওয়া স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক পারমিট এবং ভিজিট ভিসার আবেদনের প্রত্যাখ্যানের হার সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে আবেদনকারীর আর্থিক সামর্থ্য, শিক্ষাগত উদ্দেশ্য, চাকরির বাস্তবতা এবং দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে হোম অফিস এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনে বৈধ অভিবাসন কমানো এখন দেশটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে নেট মাইগ্রেশন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর কনজারভেটিভ ও লেবার—উভয় দলই অভিবাসন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সামনের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর।
বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা বলছেন, বৈধভাবে কাজ করতে গিয়ে যারা বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন এবং যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারে অবদান রাখছেন, তাদের জন্য নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তা বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে কেয়ার সেক্টরে কর্মরত হাজারো বাংলাদেশি কর্মী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যাদের ভিসার মেয়াদ, স্পন্সরশিপ, বেতন কিংবা স্থায়ী বসবাস সংক্রান্ত পরিকল্পনা রয়েছে, তাদের উচিত দ্রুত যোগ্য আইনজীবী বা অভিবাসন পরামর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করা। কারণ আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ব্রিটেনের অভিবাসন ব্যবস্থায় গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
সূত্রঃ এনডিটিভি
এম.কে

