সাত বছর বয়সী মেয়েদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা একটি ইসলামি প্রাইভেট স্কুল সরকারি অর্থায়নে আসার খবরে লন্ডনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ওয়েস্ট হেনডনের বারনেট হিল একাডেমি এতদিন স্বতন্ত্র ও ফি-নির্ভর ইসলামি স্কুল হিসেবে পরিচালিত হয়ে এলেও নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে এটি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রাথমিক ও নার্সারি স্কুলে রূপান্তরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
স্কুলটির বর্তমান পোশাকবিধি অনুযায়ী, তৃতীয় বর্ষ বা ইয়ার থ্রি থেকে মেয়েদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক। এতদিন এটি একটি বেসরকারি ইসলামি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়মের অংশ ছিল। কিন্তু সরকারি অর্থায়নের আওতায় আসার পর সেই নিয়ম বহাল থাকবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী একটি সংগঠন।
ন্যাশনাল সেক্যুলার সোসাইটি বারনেট কাউন্সিলের কাছে চিঠি দিয়ে স্কুলটির সরকারি অর্থায়নে রূপান্তর অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি বিশেষ করে শিশুদের ওপর ধর্মীয় পোশাকের বাধ্যবাধকতা নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী স্টিফেন ইভান্সের বক্তব্য, ধর্মীয় পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নারীদের নিজেদের স্বাধীন পছন্দের বিষয় হওয়া উচিত। ছোট বয়স থেকেই কোনো শিশুর ওপর এটি বাধ্যতামূলক করা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, “সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলগুলোর উচিত শিশুদের একত্রিত করা, ধর্মের ভিত্তিতে এবং এর মাধ্যমে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতেও তাদের বিভক্ত করা নয়।”
তবে এ বিতর্কের বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—হিজাব পরতে বললে ক্ষতি কী? একটি ইসলামি স্কুলে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পোশাকবিধি অনুসরণ করা যদি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের নিজস্ব নিয়ম হয়, তাহলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই নিয়ম রাখার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন কেন উঠবে—এমন যুক্তিও রয়েছে।
সমর্থকদের মতে, হিজাব পরার মাধ্যমে ছোট মেয়েরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরিচয় প্রকাশের সুযোগ পায়। একই সঙ্গে শিশুদের ব্যক্তিগত পরিসর ও শালীনতার ধারণা গড়ে তুলতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা মনে করেন।
এতদিন বারনেট হিল একাডেমি ছিল একটি প্রাইভেট স্কুল। অর্থাৎ, সেখানে ভর্তি হওয়া পরিবারগুলো স্কুলটির শিক্ষাব্যবস্থা, মূল্যবোধ ও পোশাকবিধি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিল এবং ফি দিয়ে তাদের সন্তানদের পড়াত। সেই কারণে স্কুলের নিজস্ব নিয়মকে অনেকেই “প্রাইভেট স্কুল, প্রাইভেট নিয়ম” হিসেবে দেখছেন।
কিন্তু সমস্যার জায়গাটি তৈরি হয়েছে স্কুলটির সরকারি অর্থায়নের আওতায় আসার পর। তখন রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পোশাকের বাধ্যতামূলক নীতি কতটা গ্রহণযোগ্য—সেই প্রশ্নই এখন মূল বিতর্কের কেন্দ্রে।
বারনেট কাউন্সিল অবশ্য সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কাউন্সিলের দাবি, স্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এমন একটি স্কুলের জন্য সুস্পষ্ট ও প্রমাণভিত্তিক চাহিদা রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, বারনেট এলাকায় ইতোমধ্যে সরকারি অর্থায়নে চার্চ অব ইংল্যান্ড, রোমান ক্যাথলিক ও ইহুদি স্কুল রয়েছে। কিন্তু মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য একই ধরনের ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সরকারি অর্থায়নের স্কুলের সুযোগ সীমিত ছিল। বেসরকারি স্কুলের ফি বহন করতে না পারা পরিবারগুলো এ সুযোগ থেকে কার্যত বাদ পড়ে যাচ্ছিল।
কাউন্সিলের যুক্তি, বারনেট হিল একাডেমিকে সরকারি অর্থায়নের আওতায় আনা হলে স্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের একটি চাহিদা পূরণ হবে এবং তারা আর্থিক সামর্থ্য নির্বিশেষে নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সংগঠনটির আশঙ্কা, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাক শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হলে তা রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
স্কুলটির সরকারি অর্থায়নে রূপান্তরের বিষয়টি গত সপ্তাহে বারনেট কাউন্সিলের শিশু বিষয়ক সেবার নির্বাহী পরিচালক জন অ্যান্থনি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বারনেট হিল একাডেমির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এম.কে

