যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্ডিফ সিক্সথ ফর্ম কলেজের দাতব্য তহবিল থেকে অন্তত ৫০ লাখ পাউন্ড আত্মসাতের অভিযোগে মালয়েশীয় বংশোদ্ভূত সারোয়ার দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা চলছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ওয়েলসের মারথার টিডফিল ক্রাউন কোর্টে এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
মামলায় কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক পরিচালক নাদিম সারোয়ার (৫০) শিক্ষার্থীদের ফি থেকে সংগৃহীত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তবে তার সাবেক স্ত্রী ইয়াসমিন সারোয়ার (৪৮) ক্ষমতার অপব্যবহার, চুরি, ঋণদাতাদের প্রতারণা এবং অর্থপাচারসহ মোট নয়টি অভিযোগ অস্বীকার করে বিচার মোকাবিলা করছেন। তার বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম প্রায় ১০ সপ্তাহ চলার কথা রয়েছে।
প্রসিকিউটর মার্ক কটার কেসি আদালতে জুরিদের জানান, মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে আসার পর সারোয়ার দম্পতি কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন এবং পরিচালক ও ট্রাস্টি হিসেবে বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা কলেজের দাতব্য তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত সম্পদ কেনা, বিদেশে অর্থ পাঠানো এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনে ব্যবহার করেন।
আদালতে বলা হয়, একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে কলেজের আয় এবং কর-সুবিধার অর্থ শিক্ষা কার্যক্রমেই ব্যয় করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু তদন্তে অভিযোগ ওঠে, প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি একই ধরনের নামে একাধিক গোপন ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ৪১ লাখ পাউন্ড টিউশন ফি মূল দাতব্য হিসাবে জমা না দিয়ে এসব গোপন হিসাবে পাঠানো হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াসমিন সারোয়ার কলেজের অর্থ ব্যবহার করে কার্ডিফের সিনকোয়েড এলাকায় প্রায় ১১ লাখ পাউন্ড মূল্যের একটি বাড়ি কেনেন। একই সময়ে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত তার মায়ের ব্যাংক হিসাবে ১১ লাখ পাউন্ডের বেশি অর্থ পাঠানোর অভিযোগও আনা হয়েছে।
আদালতে আরও জানানো হয়, ২০১৩ সালে ইয়াসমিন সারোয়ার কলেজের পরিচালক পদ থেকে সরে গিয়ে দুটি পৃথক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পদ গোপন এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
কার্ডিফ সিক্সথ ফর্ম কলেজের যাত্রা শুরু হয় ইয়াসমিন সারোয়ারের উদ্যোগে। ১৭ বছর বয়সে এ-লেভেল সম্পন্ন করতে মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে আসার পর ২০০৪ সালে নিজের বাড়িতে ছোট পরিসরে একটি টিউশনি গ্রুপ শুরু করেন তিনি। পরে প্রতিষ্ঠানটি দাতব্য মর্যাদা লাভ করে এবং দ্রুত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কঠোর শৃঙ্খলার কারণে ইয়াসমিন ‘টাইগার মম’ নামে পরিচিতি পান।
কলেজটিতে চীন, আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। আবাসিক শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ফি ছিল ৭৫ হাজার পাউন্ডের বেশি। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের জাতীয় এ-লেভেল ফলাফলের র্যাংকিংয়ে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষস্থান অর্জন করে। ২০১৬ সালে বিবিসির তথ্যচিত্র ‘ব্রিটেনস ব্রেনিয়েস্ট স্কুল’-এও কলেজটির প্রশংসা করা হয়।
তবে প্রসিকিউশনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার ঘাটতি ছিল। ট্রাস্টি বোর্ডে সারোয়ার দম্পতির পরিবারের সদস্যদের রাখা হয়েছিল এবং তাদের মাধ্যমে আর্থিক তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ে বলে আদালতে দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই দম্পতি নিজেদের জন্য বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতেন।
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন কাঠামো নিয়ে বিরোধের পর আগের কয়েকজন ট্রাস্টি পদত্যাগ করেন। এরপর এমন একজন অভিভাবককে ট্রাস্টি করা হয়, যিনি ইংরেজি ভাষায় স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করতে সক্ষম ছিলেন না বলে আদালতে জানানো হয়।
২০১৫ সালের শেষ দিকে কলেজের তৎকালীন পাস্টোরাল সার্ভিসেস প্রধান গ্যারেথ কোলিয়ার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। ব্যবসায়িক সফরের খরচের হিসাব চাইলে নাদিম সারোয়ার তাকে একটি বাদামি কাগজের ব্যাগে রাখা নগদ অর্থ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা নিতে বলেছিলেন বলে আদালতে অভিযোগ করা হয়।
এরপর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন অর্থ পরিচালক ড্রু লুইস-রবসন কলেজের হিসাবে ব্যাপক অসঙ্গতি শনাক্ত করেন। একজন অর্থ সহকারী প্রায় ১৮ লাখ পাউন্ডের অর্থের হিসাব খুঁজে পাচ্ছিলেন না বলে আদালতে জানানো হয়। তিনি অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাকে জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানো এবং চাকরি ছাড়ার সময় গোপনীয়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবে অনিয়মের কারণে মূল নিরীক্ষক দল ২০১১ সালের হিসাব জমা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল বলে আদালতে জানানো হয়। পরে ২০১৩ সালে রগু শিবাপালান নামে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, তিনি সারোয়ার দম্পতির দেওয়া তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেন। কোম্পানি আইনের ৫০৭ ধারায় বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্যসংবলিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ শিবাপালান ইতোমধ্যে স্বীকার করেছেন।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক বিবরণী জমা না দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর চ্যারিটি কমিশন কলেজটিতে সরাসরি পরিদর্শন চালায়। তদন্তে আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে একজন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
পরে ২০১৮ সালে বহুজাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ডিউকস এডুকেশন কার্ডিফ সিক্সথ ফর্ম কলেজটি কিনে নেয়। ফলে আদালতে চলমান মামলায় আলোচিত আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে কলেজটির বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাদিম সারোয়ারকে সাজা ঘোষণার আগে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেওয়া হয়েছে। বিচারক সেলিয়া হিউজ জানিয়েছেন, তার কারাগারে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। হিসাবরক্ষক রগু শিবাপালানও জামিনে রয়েছেন।
অন্যদিকে ইয়াসমিন সারোয়ারের বিরুদ্ধে চলমান বিচার আগামী প্রায় ১০ সপ্তাহ ধরে চলবে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
সূত্রঃ দ্য টাইমস
এমকে

