যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বিশ্বখ্যাত রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের জাতীয় পর্যায়ের সংগীত প্রতিযোগিতা ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। নিজের লেখা ও সুর করা ধ্রুপদি পিয়ানো সংগীত পরিবেশন করে বিচারকদের মুগ্ধ করে এই সম্মান অর্জন করেছে সে। নাভহানের এই সাফল্যে আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে উজ্জ্বল হয়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক তরুণ প্রতিভার নাম।
লন্ডনের ঐতিহাসিক রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীরা জ্যাজ, পপ, গ্রাইম ও ধ্রুপদি সংগীত পরিবেশন করেন। তাদের মধ্যে নিজের মৌলিক পিয়ানো কম্পোজিশন উপস্থাপন করে চ্যাম্পিয়ন নির্বাচিত হয় নাভহান।
‘লা দ্যুল্যর এক্সকিজ’ নামের ফরাসি শিরোনামের সংগীতটির অর্থ ‘তীব্র বেদনা’। এফ-শার্প মাইনর স্কেলে রচিত এই সুরের মূল বিষয় যুদ্ধ ও ভালোবাসা। দুই বিপরীত অবস্থানে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প পিয়ানোর দুই হাতের ভিন্নধর্মী সুরের মাধ্যমে তুলে ধরেছে নাভহান। সংঘাত, আবেগ, বেদনা ও ভালোবাসার এই সংগীতের মূল বার্তা—ঘৃণা ও সংঘাতের বিপরীতে ভালোবাসার জয়।
এবারের প্রতিযোগিতায় হাজারো আবেদন জমা পড়ে। প্রাথমিক বাছাই ও সরাসরি অডিশনের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় প্রতিযোগীরা। গত মে মাসে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর অডিশনের জন্য নির্বাচিত হয় নাভহান। জুনে সরাসরি অডিশনে অংশ নেওয়া ২৫ জনের মধ্যে জায়গা পায় সে। সেখান থেকে নির্বাচিত নয়জন প্রতিযোগী চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেন।
নাভহানের মা রুবেনা চৌধুরী জানান, ইনস্টাগ্রামে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের ‘ফিউচার মেকার্স’ প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন দেখে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তার ছেলে। প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীদের নিজস্ব রচিত মৌলিক সংগীত জমা দিতে হয়। নাভহান নিজের তৈরি পিয়ানো কম্পোজিশন জমা দিয়েছিল।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ফলে আগামী এক বছর সংগীতশিল্পের পেশাদারদের কাছ থেকে বিশেষ সহায়তা পাবে নাভহান। সংগীত প্রযোজনা, রেকর্ডিং, প্রচারণা এবং পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করা হবে। অভিজ্ঞ সংগীত প্রযোজকদের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি রেকর্ডিং স্টুডিও ব্যবহারের সুযোগ এবং রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের এলগার রুমে নিজস্ব সংগীত পরিবেশনার সুযোগও রয়েছে।
২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া নাভহান বর্তমানে দেশটির ঐতিহ্যবাহী আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হ্যারো স্কুলের শিক্ষার্থী। ১৩ বছর বয়সীদের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংগীতবৃত্তি পেয়ে সেখানে পড়াশোনার সুযোগ পায় সে। স্কুলটিতে পিয়ানো ও চেলো—দুটি বাদ্যযন্ত্রেই উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে নাভহান। পাশাপাশি গিটার বাজানো ও আধুনিক সংগীতেও তার দক্ষতা রয়েছে।
পিয়ানো ও চেলোতে ডিপ্লোমা পর্যায়ের যোগ্যতা অর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। সংগীতের বিভিন্ন গ্রেড পরীক্ষায় অল্প বয়সেই ‘ডিস্টিংশন’ অর্জন করেছে। তার রয়েছে ‘পারফেক্ট পিচ’—অর্থাৎ কোনো সুরের স্বর নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার বিশেষ ক্ষমতা।
হ্যারো স্কুলের বায়রন কনসোর্ট চেম্বার কয়ারের সদস্য নাভহান। এই সংগীত দলের জন্য তার লেখা গান যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পরিবেশিত হয়েছে। এ ছাড়া স্কুলের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও স্ট্রিং অর্কেস্ট্রার সদস্য হিসেবেও কাজ করছে সে। বিগ ব্যান্ডের সঙ্গে কণ্ঠসংগীত পরিবেশনেও অংশ নেয়।
হ্যারো স্কুলে ভর্তির আগে নাভহান ব্রেন্টউড স্কুলে সংগীতবৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেছে। পাশাপাশি লন্ডনের গিল্ডহল স্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামার জুনিয়র বিভাগে পিয়ানো, চেলো ও সংগীত রচনার প্রশিক্ষণ নিয়েছে।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ। মায়ের গাওয়া ঘুমপাড়ানি গানের সুর অনুকরণের মধ্য দিয়ে সংগীতের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। আট বছর বয়সের দিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগীত শেখা শুরু করে সে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে লন্ডনের ঐতিহাসিক ড্রেপার্স হলে নিজের রচিত সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসা পেয়েছিল নাভহান। সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের বিনিয়োগ কমিটির বার্ষিক নৈশভোজে তার পরিবেশনা শেষে অতিথিরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান।
নাভহানের বাবা মোহাম্মদ মতিউল ইসলাম চৌধুরীর বাড়ি বাংলাদেশের দিনাজপুরে। তিনি ১৯৯৪ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। মা রুবেনা চৌধুরীর আদি বাড়ি সিলেটে; তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। দুই সন্তানের মধ্যে নাভহান ছোট।
সংগীতের সঙ্গে পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। নাভহানের মা ছোটবেলা থেকে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান গাইতেন। লন্ডনের ভারতীয় বিদ্যা ভবনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতের প্রশিক্ষণ নিয়ে দুই বছরের পরীক্ষায় ‘ডিস্টিংশন’ অর্জন করেন তিনি। নাভহানের বড় বোনও ছোটবেলা থেকে বেহালা ও পিয়ানো বাজানোর পাশাপাশি গান করতেন।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী এবং গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী ছিলেন নাভহানের ফুফা। পারিবারিক সংগীতচর্চা ও পরিবেশ তার সংগীতের প্রতি আগ্রহ গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।
রয়্যাল অ্যালবার্ট হল ২০২২ সাল থেকে ‘ফিউচার মেকার্স’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। যুক্তরাজ্যের ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ সংগীতশিল্পীদের প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং তাদের পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তুলতে সহায়তা করাই এ আয়োজনের লক্ষ্য। এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ীকে শুধু সম্মাননা দেওয়া হয় না, বরং সংগীতশিল্পের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজের সুযোগসহ এক বছরের বিশেষ সহযোগিতাও দেওয়া হয়।
নাভহানের এই অর্জন যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নতুন প্রজন্মের প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছে।
সূত্রঃ নিউজ মিনিমালিস্ট
এমকে

