উত্তর ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টার সময় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা নতুন করে অভিবাসন সংকটকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এক নারী উদ্ধারকর্মীদের কাছে বারবার আকুতি জানান, যেন তাকে তার স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে দেওয়া হয়। একই সময়ে ছোট নৌকায় অভিবাসন ঠেকাতে যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স যৌথ উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, উত্তর ফ্রান্সের হার্ডেলো সমুদ্রসৈকতের কাছে একটি অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ছোট নৌকায় ওঠার চেষ্টা করছিলেন ওই নারী। এক পর্যায়ে তিনি পানিতে পড়ে গেলে উদ্ধারকর্মীরা তাকে নিরাপদে তীরে নিয়ে আসেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তার অন্তত একটি সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা তখনও নৌকাতেই ছিলেন। পরে নৌকাটি তীরের আরও কাছে ভেসে এলে ওই নারী আবার পানিতে নেমে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে বিরোধী দলের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র ক্রিস ফিল্প উত্তর ফ্রান্স সফর করে দাবি করেন, ছোট নৌকায় অভিবাসন ঠেকাতে সরকারের পরিকল্পনা কার্যকর নয়। একটি সম্প্রচারে তিনি জানান, কয়েক ঘণ্টার অনুসন্ধানেই তিনি সমুদ্র উপকূলে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া অভিবাসীদের একটি দলকে দেখতে পান। তার অভিযোগ, ওই এলাকায় ফরাসি নিরাপত্তা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল না, যদিও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে ফ্রান্সের সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক চুক্তি হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে তিন বছরের একটি নতুন সীমান্ত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় ড্রোন, হেলিকপ্টার, উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের মাধ্যমে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের কথা বলা হয়। তবে বিরোধী দলের দাবি, বাস্তবে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ক্রিস ফিল্প আরও দাবি করেন, অনেক অভিবাসী ফ্রান্সে আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তার মতে, যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মানবপাচারকারীরা তাদের প্রলুব্ধ করছে। তিনি সরকারের প্রতি কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সরকারের অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, সামগ্রিকভাবে ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপারের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার দাবি, সরকারের নেওয়া পরিকল্পনার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, ছোট নৌকায় অবৈধ প্রবেশ রোধে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। সরকারের দাবি, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের অপসারণের হার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, আশ্রয় আবেদন কমেছে এবং ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ অভিযানে নির্বাচনের পর থেকে ৪৬ হাজারের বেশি সম্ভাব্য পারাপারের চেষ্টা প্রতিরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৭০ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাজ্য থেকে অপসারণ বা ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত এক বছরে প্রায় ৩৬ হাজার মানুষ ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনুকূল আবহাওয়ার সুযোগে চ্যানেল পারাপারের প্রচেষ্টা আবারও বেড়েছে বলে সীমান্ত পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
বিশ্লেষকদের মতে, চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা, মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয়তা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ—সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ইস্যু আগামী দিনগুলোতেও দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও মানবিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
সূত্রঃ এলবিসি
এম.কে

