লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের হোয়াইটচ্যাপেলে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইতিহাসের অন্যতম অগ্রদূত আইয়ুব আলী মাস্টারের সম্মানে একটি স্মারক ফলক উন্মোচন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের উদ্যোগে ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রিটে ফলকটি উন্মোচন করা হয়।
১৯০০ সালে সিলেটে জন্ম নেওয়া আইয়ুব আলী মাস্টার ১৯২০-এর দশকে পূর্ব লন্ডনে বসতি স্থাপন করেন। কমার্শিয়াল স্ট্রিটে তিনি শাহ জালাল রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী সময়ে এশীয় সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব লন্ডনে দক্ষিণ এশীয় নাবিক ও অভিবাসীদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন আইয়ুব আলী মাস্টার। তার স্যান্ডিস রো-র ১৩ নম্বর বাড়িটিও লস্কর বা বাঙালি নাবিকদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কঠিন কর্মপরিবেশ ও চুক্তিগত বিধিনিষেধ থেকে পালিয়ে আসা নাবিকদের তিনি আশ্রয়, খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতেন। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সহযোগিতা করতেন।
১৯৪৩ সালে আইয়ুব আলী মাস্টার ও শাহ আবদুল মজিদ কুরেশি ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রিটে ইন্ডিয়ান সিমেনস ওয়েলফেয়ার লীগের কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির মাধ্যমে দক্ষিণ এশীয় নাবিক ও অভিবাসীদের কল্যাণে সহায়তা আরও সংগঠিত করা হয়। বর্তমানে যে স্থানে স্মারক ফলকটি স্থাপন করা হয়েছে, সেটি ওই ঐতিহাসিক কার্যালয়ের কাছাকাছি।
আইয়ুব আলী মাস্টারের নাতনি পারুল হুসাইন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্মারক ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক আয়োজন নিয়ে তাদের পরিবার অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইয়ুব আলী মাস্টার ছিলেন ব্রিটেনে আসা প্রথমদিকের বাংলাদেশি অগ্রদূতদের একজন এবং ব্রিটেনে নতুন করে আসা বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বহু মানুষকে তিনি সহায়তা করেছিলেন। ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় দক্ষ হওয়ায় তিনি অভিবাসীদের বিভিন্ন প্রয়োজনেও সহযোগিতা করতে পারতেন।
পারুল হুসাইন আরও বলেন, ১৯৪০-এর দশকে ইন্ডিয়ান সিমেনস ওয়েলফেয়ার লীগের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়ের জন্যও তার দাদা নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, আইয়ুব আলী মাস্টার ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক। তার নিরলস প্রচেষ্টা বরোতে সম্প্রদায়ভিত্তিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল এবং একজন বিশ্বস্ত নেতা ও অধিকারকর্মী হিসেবে তিনি গভীর সম্মান অর্জন করেছিলেন। তার উত্তরাধিকার প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনাকে স্মরণ করার জন্য ২০১৩ সালে তাদের ঐতিহাসিক স্মারক ফলক কর্মসূচি চালু করা হয়। এই কর্মসূচির আওতায় বাসিন্দারা প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে পারেন। আইয়ুব আলী মাস্টার এই উদ্যোগে বৈধ ভোটের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন।
কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের আওতায় টাওয়ার হ্যামলেটসজুড়ে এখন পর্যন্ত মোট আটটি স্মারক ফলক স্থাপন করা হয়েছে। এসব ফলকের মাধ্যমে তাসাদ্দুক আহমেদ, মার্জ হিউসন, নিকোলাস কালপেপার, আলফ্রেড হিচকক, টমি ফ্লাওয়ার্স, সওয়াবুল্লাহ মুন্সি ও ক্লারা গ্রান্টসহ স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিকে সম্মান জানানো হয়েছে।
স্মারক ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আইয়ুব আলী মাস্টারের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে স্বাধীনতা ট্রাস্টের সদস্যরাও ছিলেন। স্বাধীনতা ট্রাস্টের চেয়ার জুলি বেগম বলেন, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ব্রিটিশ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যেই সংগঠনটি কাজ করছে।
জুলি বেগম আরও বলেন, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীনতা ট্রাস্ট ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছে। সংগঠনটির ২৫তম বার্ষিকীর সময়ে টাওয়ার হ্যামলেটসে আইয়ুব আলী মাস্টারের স্মারক ফলক উন্মোচনে সহযোগিতা করতে পেরে তারা গর্বিত।
তিনি জানান, আইয়ুব আলী মাস্টারের অবদানের স্বীকৃতির জন্য বাংলাদেশি সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালিয়ে আসছে। ব্রিটেনে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই তিনি স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনমতো মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে আসছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাধীনতা ট্রাস্ট সম্প্রতি বিনামূল্যে বাংলা ঐতিহ্যবিষয়ক পদযাত্রা চালু করেছে। এসব পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা আইয়ুব আলী মাস্টারের কর্মকাণ্ড ও ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইতিহাসের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে পারবেন।
আইয়ুব আলী মাস্টারের স্মারক ফলকটি ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রিটে ড্রুয়েট হাউসের পাশের দেয়ালে স্থাপন করা হয়েছে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানটি টাউন হলের কাছাকাছি হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের জন্যও সহজে দেখার সুযোগ রয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান সিরিজ
এম.কে

