7.6 C
London
October 8, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

৫ শর্ত পূরণ না হলে মিয়ানমারে ফিরতে চান না ৮৭% রোহিঙ্গা

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ মিয়ানমারে ফেরার বিষয়ে শর্তসাপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক তদারকি, জমি ও বাড়িঘর ফিরিয়ে দেওয়া, অবাধ চলাচল এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষা-জীবিকার মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত না হলে ৮৭ শতাংশ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরতে চান না। একই সঙ্গে তারা বিচার ও জবাবদিহির নিশ্চয়তাও চান।

বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘অনিশ্চিত ঘরে ফেরা: উখিয়ার ক্যাম্প থেকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে দিনব্যাপী প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়।

গবেষণাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা গত ২ থেকে ৬ আগস্ট কক্সবাজারের উখিয়ার ১৭টি রোহিঙ্গা শিবিরে পরিচালনা করেন। জরিপে অংশ নেন ৮১৬ জন রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৫ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ৭২ জন রোহিঙ্গার বিস্তারিত সাক্ষাৎকার, হেড মাঝিদের নিয়ে দলীয় আলোচনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় ৩৬টি বিষয় বা ধারা ধরে গুণগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮১৬ জনের মধ্যে ৭১৩ জন, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশের বেশি, জানিয়েছেন যে তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান না। তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, এর অর্থ এই নয় যে তারা চিরতরে মিয়ানমারে ফেরার বিরোধী। বরং নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিজস্ব জমি ও বাড়িঘর ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক তদারকিসহ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে তারা নিজ দেশে ফিরতে আগ্রহী।

রোহিঙ্গাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে অতীতের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কারণে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রায় ২০ শতাংশ জরিপ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, মিয়ানমারে তাদের সম্পত্তির মালিকানা রয়েছে। ফলে জমি ও বাড়িঘর ফিরে পাওয়ার বিষয়টিও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উঠে এসেছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন শিবিরে বসবাস করছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। শিবিরে দীর্ঘদিনের অবস্থানের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং মানব পাচারসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের বক্তব্যে শিবিরে চাঁদাবাজি, অপহরণ, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে। তাদের অভিযোগ, বিকেল থেকে অনেক শিবিরে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়ে যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মুক্তিপণের জন্য অপহরণের ঘটনাও ঘটছে। এ ধরনের ঘটনায় ২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারকে নিজেদের মাতৃভূমি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছেন না; বরং যে পরিস্থিতি তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চান না।

তিনি বলেন, শুধু সীমান্ত পার করে দিলেই প্রত্যাবাসন সফল হয়েছে বলা যায় না। বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলোর সমাধান, অধিকার সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে টেকসই সমাধানের দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান বলেন, টেকসই প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করবে। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অবস্থান করায় তহবিল সংকটসহ মানবিক সংকটও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবার আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় রোহিঙ্গাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষার ঘাটতি এবং অপহরণ, চাঁদাবাজি ও শারীরিক সহিংসতার মতো সমস্যাগুলো উঠে এসেছে। এসব বিষয় প্রকাশ্যে এনে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা প্রতিনিধি মো. শফিক বলেন, তাদের প্রধান সমস্যা নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব, ভূমির অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হলে তা টেকসই হবে না। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চান।

গবেষণায় রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৬ শতাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর প্রায় ২১ শতাংশ জাতিসংঘের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ৪ শতাংশ রোহিঙ্গা মিয়ানমার সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছেন। প্রায় ১৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বিশ্বাস করেন না।

গবেষণায় বলা হয়েছে, শিবিরের বর্তমান জীবনও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। একদিকে তারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশেও তাদের স্থায়ীভাবে একীভূত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে জরুরি মানবিক সহায়তা কমে গেলেও স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত।

২০২৬ সালের যৌথ সাড়া পরিকল্পনায় অর্থায়নের পরিমাণ ৭১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু মাসিক রেশন ১২ মার্কিন ডলার থেকে কমে ৭ ডলারে নেমেছে।

রেশন কমে যাওয়ায় কিছু রোহিঙ্গা পুরুষ শিবিরের বাইরে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এতে তাদের অপহরণ ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। কর্মহীনতা থেকে জুয়া, পারিবারিক সহিংসতা, ঋণগ্রস্ততা এবং মানব পাচারের মতো সমস্যাও তৈরি হচ্ছে বলে সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।

শিবিরের আবাসন পরিস্থিতিও সংকটপূর্ণ। সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই জানিয়েছেন, ১০ ফুট বাই ১৫ ফুটের ছোট ঘরে ছয় থেকে ১০ জন পর্যন্ত বসবাস করছেন। শিক্ষা ব্যবস্থা সনদপ্রাপ্ত নয়, স্বাস্থ্যসেবা সীমিত, চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং আইনগতভাবে চাকরি করার সুযোগও নেই।

গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধবিজ্ঞান গবেষণা ফোরামের সভাপতি সাফায়েত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আদৃতা আরিফ। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।

গবেষণার সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের বড় অংশ নিজ দেশে ফেরার বিরোধী নয়; বরং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা চায়। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার, মৌলিক সেবা এবং আন্তর্জাতিক তদারকির মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসনকে টেকসই করা কঠিন হবে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

সূত্রঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা

এমকে

আরো পড়ুন

সাবেক এমপি নাঈমুর রহমান দুর্জয় গ্রেপ্তার

বায়তুল মোকাররমের নতুন খতিব মুফতি আবদুল মালেক

গুলশানে বিলাসবহুল ভবনের বাসিন্দার তালিকায় ছিল টিউলিপের নাম