যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর সরাসরি আলোচনায় বসেছে ইসরায়েল ও লেবানন। ১৯৯০-এর দশকের পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সংলাপ শুরু হলো, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুরু থেকেই অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত দুই দেশের রাষ্ট্রদূতরা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-এর উপস্থিতিতে এই বৈঠকে অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এটি মূলত ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরির জন্য একটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক।
তবে বৈঠক শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ শহর টায়ারে ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। একই সময়ে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগত শহর বিনত জবেইল দখলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়, আর হিজবুল্লাহ আগের চেয়ে বেশি হারে ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায়। মঙ্গলবার একদিনেই লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনায় লেবাননের অবস্থান তুলনামূলক দুর্বল। কারণ দেশটির সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অক্ষম এবং ইসরায়েলের কাছে দেওয়ার মতো কার্যকর কোনো কৌশলগত সুবিধাও তাদের হাতে নেই। একই সঙ্গে, ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসা উচিত কি না—এ প্রশ্নে লেবাননের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র।
লেবাননের সাধারণ জনগণের মধ্যেও এই আলোচনা নিয়ে সন্দেহ প্রবল। তাদের আশঙ্কা, কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা হলেও তা ইসরায়েলি হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দেবে না। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে দেশটিতে প্রায় ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর অবস্থানও আলোচনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটির মহাসচিব নাঈম কাসেম ইতোমধ্যে লেবানন সরকারকে আলোচনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া জ্যেষ্ঠ নেতা ওয়াফিক সাফা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই আলোচনার কোনো ফলাফল তারা মেনে নেবে না।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, লেবানন সরকার আলোচনার পরবর্তী ধাপে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি দাবি করতে পারে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানরত ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারও তাদের প্রধান দাবির মধ্যে থাকবে। বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভেতরে প্রায় ছয় মাইল পর্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল আলোচনায় এসেছে দুটি মূল শর্ত নিয়ে—হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং লেবাননের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক চাপ ছাড়া ইসরায়েল স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে না এবং দখলকৃত এলাকা থেকেও দ্রুত সরে আসার সম্ভাবনা কম।
এই আলোচনায় আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবও স্পষ্ট। ইরান হিজবুল্লাহকে আলোচনায় বাধা না দিতে চাপ দিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে।
সব মিলিয়ে, বহু প্রতীক্ষিত এই সংলাপ শুরু হলেও মাঠের পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনো অনেক দূরের বলে মনে করছেন
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

