21.9 C
London
August 31, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

চারপাশে ধ্বংসস্তূপ, তবু অটুট বাড়ি—নেপালের ভয়াবহ বন্যায় ‘অলৌকিক’ বেঁচে থাকার গল্প

হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যা, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি-সড়ক-সেতু; প্রবল স্রোতের মধ্যেও টিকে গেল ফিরোজা রঙের বাড়িটি

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় চারপাশের ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলেও আশ্চর্যজনকভাবে অক্ষত রয়েছে একটি ফিরোজা রঙের বাড়ি। নুয়াকোট জেলার ত্রিশুলি বাজার এলাকায় অবস্থিত বাড়িটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে ‘মিরাকল হাউস’ বা ‘অলৌকিক বাড়ি’ এবং ‘গ্রিন হাউস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

প্রবল স্রোত, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের আঘাতেও বাড়িটির মূল কাঠামো টিকে যাওয়ায় এটি এখন ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বাড়িটির দৃশ্য ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে উপত্যকার দিকে নেমে আসে। এর ফলে সৃষ্টি হয় আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা। বরফ, বিশাল পাথর, গাছপালা এবং বিপুল পরিমাণ কাদা নিয়ে প্রবল স্রোত ত্রিশুলি নদী ধরে নেমে আসে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদীর আশপাশের জনপদে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়।

বন্যার স্রোতে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ভেসে যায়। যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং দুর্গম অনেক এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশুলি নদীর প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার নিম্নধারায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১৯টি সেতু ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বন্যার ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ত্রিশুলি বাজারের ওই বাড়িটির ভিডিওতে। সেখানে দেখা যায়, বাড়িটির নিচের তলা দিয়ে প্রচণ্ড বেগে পানি ও কাদার স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। পানির তোড়ে দরজা-জানালা পর্যন্ত ভেঙে যাচ্ছে। চারপাশের স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলেও রিইনফোর্সড কংক্রিটে নির্মিত বাড়িটির মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে।

বাড়িটিতে বসবাস করেন ৪৫ বছর বয়সী প্রকাশ পাণ্ডে প্যাকুরেল, তার স্ত্রী, দুই সন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবা। বন্যা আঘাত হানার সময় প্রকাশ ও তার স্ত্রী বাড়ির কাছের একটি দোকানে ছিলেন। তাদের সাত বছর বয়সী ছেলে মাত্র ১৫ মিনিট আগে স্কুলের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। অন্যদিকে ১১ বছর বয়সী মেয়ে তখন স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

হঠাৎ চারদিক থেকে কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোত ধেয়ে আসায় নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার মতো সময় ছিল না পরিবারের সদস্যদের হাতে। বাধ্য হয়ে প্রকাশ ও তার স্ত্রী দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা তারা বাড়ির ভেতরে আটকা ছিলেন।

প্রকাশের স্ত্রী জানান, চারদিক থেকে বরফ, কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষ বাড়িটিতে আঘাত করছিল। একপর্যায়ে বাড়িটি কাঁপতে শুরু করলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মনে হচ্ছিল, হয়তো আর বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, তারা এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সেই পরিস্থিতি থেকে তারা প্রাণে বেঁচে যান। পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনাটি এখনো অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে।

পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর বাড়ির এক সদস্য লাল পতাকা উড়িয়ে আকাশে থাকা হেলিকপ্টারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরে উদ্ধারকারীরা তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

এদিকে ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপাল ও চীনে প্রাণহানি দ্রুত বাড়ছে। সোমবার ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজারের বেশি মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনায়, এটি সাধারণ কোনো বন্যা ছিল না। বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নিয়ে প্রবাহিত স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদের ওপর আছড়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা কেশব প্রসাদ বারাল বলেন, স্রোতটি শুধু পানি ছিল না; বিশাল কাদার স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে এসেছিল। স্ত্রীকে হাত ধরে বাঁচানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাকে সেই কাদার স্রোত থেকে রক্ষা করতে পারেননি বলে জানান তিনি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩২ মিনিটে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্তত চারটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়।

একদিকে যখন ত্রিশুলি নদীর তাণ্ডবে বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তখন সেই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও অক্ষত থাকা ফিরোজা রঙের বাড়িটি মানুষের নজর কেড়েছে। ভয়াবহ দুর্যোগের পরও বাড়িটির কাঠামো টিকে যাওয়ায় স্থানীয়দের কাছে এটি এখন শুধু একটি ভবন নয়—বরং মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার এক বিস্ময়কর গল্পের প্রতীক।

সূত্রঃ এপি

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ডাক ম্যাক্রোঁর

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি ভারত-পাকিস্তান সংঘাত থামায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের অস্বীকার

লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা ঘিরে উত্তেজনাঃ হিজবুল্লাহ অস্বীকার