Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

তিন ব্রিটিশ বিমানবন্দরে বড় সাইবার হামলাঃ ৮৭ লাখ গ্রাহকের তথ্য হ্যাকারদের হাতে

যুক্তরাজ্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৮৭ লাখ গ্রাহকের তথ্য অননুমোদিতভাবে হ্যাকারদের হাতে চলে গেছে। আক্রান্ত বিমানবন্দরগুলো হলো ম্যানচেস্টার, লন্ডন স্ট্যানস্টেড এবং ইস্ট মিডল্যান্ডস। তিনটি বিমানবন্দরই পরিচালনা করে ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপ।

২৭ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপ মঙ্গলবার সাইবার হামলার বিষয়টি জানতে পারে। তবে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারীরা এর কয়েক দিন আগেই সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডারে প্রবেশ করেছিল।

হামলায় গ্রাহকদের বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবার তথ্য আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাড়ি পার্কিং বুকিং, বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ব্যবহার, দ্রুত নিরাপত্তা পার হওয়ার সেবা এবং বিমানবন্দরের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের নিবন্ধন। হ্যাকাররা গ্রাহকদের ই-মেইল ঠিকানা, ফোন নম্বর, গাড়ির নিবন্ধন নম্বর এবং পোস্টকোডে প্রবেশাধিকার পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপ জানিয়েছে, আক্রান্ত ৮৭ লাখ গ্রাহকের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষেত্রে কেবল ই-মেইল ঠিকানা অননুমোদিতভাবে দেখা হয়েছে। ফলে সবার ক্ষেত্রে সমপরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।

গ্রাহকদের পাঠানো এক বার্তায় ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপ জানিয়েছে, বিমানবন্দরের গাড়ি পার্কিং, লাউঞ্জ, দ্রুত প্রবেশসেবা ও বিমানবন্দরের ওয়াই-ফাই নিবন্ধনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তিগত তথ্য অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে হ্যাক হয়েছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হ্যাকাররা যে ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল সেখানে গ্রাহকদের ব্যাংক বা অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য ছিল না বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে সরাসরি ব্যাংক হিসাবের তথ্য চুরি হয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

হামলার পর ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপ দ্রুত আক্রান্ত ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিশেষজ্ঞ সাইবার নিরাপত্তা পরামর্শকদের সহায়তায় তদন্ত ও ঝুঁকি মোকাবিলার কাজ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ঘটনাটি বিমানবন্দরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করেনি।

তিন বিমানবন্দরে নির্ধারিত ভবিষ্যৎ বুকিংও বহাল রয়েছে। যাত্রীদের গাড়ি পার্কিংসহ সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোও স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা কিংবা বিমান চলাচলের নিরাপত্তা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

তবে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় সম্ভাব্য প্রতারণা নিয়ে গ্রাহকদের সতর্ক করেছে ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপ। অপ্রত্যাশিত কোনো ই-মেইল, ফোনকল বা খুদে বার্তা পেলে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ পরিশোধ, ব্যাংকিং তথ্য বা আর্থিক বিবরণ চাইবে না। ফলে সাইবার হামলার পর কেউ বিমানবন্দরের নাম ব্যবহার করে টাকা বা ব্যাংকিং তথ্য চাইলে সেটিকে প্রতারণার চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এই হামলার পর যুক্তরাজ্যের বিমান পরিবহন খাতে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ ম্যানচেস্টার, স্ট্যানস্টেড ও ইস্ট মিডল্যান্ডস—তিন বিমানবন্দরই বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিচালনা করে।

ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপের তিন বিমানবন্দরে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৭০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছেন। একই সময়ে আগের ১২ মাসের হিসাবে তিন বিমানবন্দরের মোট যাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৬৮ লাখ। স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর একাই জুলাইয়ে ৩১ লাখের বেশি যাত্রী পরিচালনা করে, যা বিমানবন্দরটির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যস্ত মাস ছিল।

এত বিপুল সংখ্যক যাত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলার ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ই-মেইল ঠিকানা, ফোন নম্বর, গাড়ির নিবন্ধন নম্বর ও পোস্টকোডের মতো তথ্য সরাসরি ব্যাংকিং তথ্য না হলেও এগুলো ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে লক্ষ্যভিত্তিক প্রতারণা বা ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা সম্ভব।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হামলার পেছনে কারা রয়েছে তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, অপরাধী চক্র বা রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীকে দায়ী করার মতো তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ঘটনাটিকে আপাতত একটি বড় সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘন হিসেবেই তদন্ত করা হচ্ছে।

ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্টস গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এনে গ্রাহক ও নিজেদের ব্যবস্থার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং হামলার প্রকৃতি, কতটা তথ্য অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় আরও পরিষ্কার হতে পারে তদন্ত এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে ক্রমবর্ধমান সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে তিন বিমানবন্দরের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের তথ্য আক্রান্ত হওয়ার এই ঘটনা ব্রিটেনের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্রঃ মিরর

এম.কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *