23.7 C
London
August 16, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকবাংলাদেশ

বাংলাদেশ থেকে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরানোর ঘোষণা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক জান্তা। তবে প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে তারা।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক সামরিক অভিযানের পর প্রাণ বাঁচাতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই সময় হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিভুক্ত করে। এরপর থেকে প্রায় এক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে ঢাকার সঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।

জান্তার দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখের বেশি মানুষকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। এ ছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি করেছে জান্তা।

২০১৭ সালের সহিংসতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিয়ানমার সরকার আবারও দাবি করেছে, ওই সময় রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই রাখাইনে সেনা অভিযান শুরু করা হয় বলে তাদের বক্তব্য।

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্যাতন ও গ্রাম ধ্বংসের অভিযোগ তুলে আসছে। ওই অভিযানের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে থেকেই বিভিন্ন সময়ে সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে আরও বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয় নিয়েও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। দেশটির সরকার রোহিঙ্গাদের স্বীকৃত জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে গ্রহণ করে না। বরং তাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা নিজেদের রাখাইন অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হিসেবে দাবি করে।

মিয়ানমারের জান্তা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়েও ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। তাদের দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গিয়েছিল ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ এবং উত্তর রাখাইনে আরও প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা থেকে যায়। বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে—এমন হিসাবও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দুই বছরের একটি চুক্তি হয়েছিল। তবে নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় সেই উদ্যোগ বাস্তবে সফল হয়নি। পরবর্তীতে ২০২১ সালে অং সান সুচির সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠার পাশাপাশি ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘাত শুরু হয়। সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে চলে যাওয়ায় প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

এ অবস্থায় মিয়ানমারের জান্তার পক্ষ থেকে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরানোর ঘোষণা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করলেও বাস্তবে কবে এবং কীভাবে তাদের ফেরানো হবে, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট সময়সূচি বা কার্যকর কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি।

ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের এই ঘোষণা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হয়, তা নির্ভর করবে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর।

সূত্রঃ এমটিআই

এম.কে

আরো পড়ুন

হামলার ভয়ে একরাতে ৫ বার বাঙ্কারে লুকান মার্কিন রাষ্ট্রদূত

মাইক্রোসফটের হাতে ফিলিস্তিনিদের রক্তঃ এক নারীর প্রতিবাদ

নিউ ইয়র্কের ব্যালট পেপারে বাংলা ভাষা