যুক্তরাজ্যের বিচারব্যবস্থায় চলমান সংকটের কারণে দেশটিতে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে সতর্ক করেছেন বিচার খাতের ছয়টি জাতীয় সংগঠনের নেতারা।
কারাগার, প্রবেশন, পুলিশ ও আদালতের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠিতে তারা বলেছেন, এসব প্রতিষ্ঠান তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিঠিতে ছয়টি সংগঠনের নেতারা পুরো ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য একটি রয়্যাল কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তাদের সদস্যরা এমন পরিস্থিতিতে কাজ করতে করতে ক্ষুব্ধ, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে তাদের রাখা হচ্ছে এবং কোনো সমস্যা হলে তাদেরই দায়ী করা হচ্ছে।
চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে কারাগারের চাপ কমাতে প্রায় ৫ হাজার বন্দিকে আগাম মুক্তি দেওয়ার যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, প্রবেশন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনার উপযোগী না হলে সেটিও ব্যর্থ হতে পারে।
এই সতর্কবার্তায় যুক্ত থাকা সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রিজন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন বা পিওএ, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব প্রোবেশন অফিসার্স এবং পুলিশ ফেডারেশন অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন, পাবলিক অ্যান্ড কমার্শিয়াল সার্ভিসেস ইউনিয়ন এবং রয়্যাল কলেজ অব নার্সিংয়ের নেতারাও চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার থেকে বিচার, কারাবন্দিত্ব থেকে মুক্তি—ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে পুনরায় অপরাধ করার প্রবণতা বাড়ছে। তাদের দাবি, সহিংস, অপরিচ্ছন্ন ও অতিরিক্ত জনাকীর্ণ কারাগারে বন্দিদের কার্যকর পুনর্বাসন করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংগঠনগুলোর নেতারা বলেছেন, প্রবেশন ব্যবস্থাকে কার্যকর না করে আগাম কারামুক্তির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে না। একই সঙ্গে মামলার জট কমাতে জুরি ট্রায়ালের সংখ্যা সীমিত করার পরিকল্পনার বিরোধিতাও করেছেন তারা।
তাদের দাবি, আগের সরকারের সময়ে ব্যয় সংকোচন এবং বিপুলসংখ্যক আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে মামলার জট তৈরি হয়েছে। সেই জট মোকাবিলায় জুরি ট্রায়াল সীমিত করার পরিকল্পনাকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রিজন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় চেয়ারম্যান মার্ক ফেয়ারহার্স্ট বলেন, কারাগার, প্রবেশন, আদালত ও পুলিশ—ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রতিটি অংশই সংকটের মধ্যে রয়েছে। তিনি পুরো ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য রয়্যাল কমিশন গঠনের আহ্বান জানান।
সংগঠনগুলোর নেতারা আরও বলেছেন, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং সরকারি পরিষেবায় আউটসোর্সিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে কারাগার, প্রবেশন, পুলিশ ও আদালত সংকটে পড়েছে। তাদের মতে, এর ফলে অপরাধ কমানো এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তারা প্রস্তাবিত রয়্যাল কমিশনের সামনে বিচারক, আইনজীবী, বিচারব্যবস্থার সামনের সারির কর্মী, কারাবন্দি এবং সাবেক কারাবন্দিদেরসহ বিভিন্ন পক্ষের সাক্ষ্য ও মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, তারা বিচারব্যবস্থার সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, নতুন সরকার এমন একটি বিচারব্যবস্থা পেয়েছে, যা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কারাগারে আরও ১৪ হাজার জায়গা তৈরি করা হচ্ছে, আদালতের মামলার জট কমানোর কাজ চলছে, অপরাধীদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে এবং প্রবেশন ও অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তায় রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও হাজার হাজার পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হচ্ছে এবং গত ২০০ বছরের মধ্যে পুলিশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংস্কার কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিচারব্যবস্থার সংকটের মধ্যে কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, আগাম কারামুক্তি এবং আদালতের মামলার জট কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে বিচার খাতের ছয়টি জাতীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে পুরো ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য রয়্যাল কমিশনের দাবি সামনে এসেছে।
সূত্রঃ ডেইলি মিরর
এম.কে
