ব্রিটেনের অন্যতম বৃহৎ ক্যানসার গবেষণা দাতব্য সংস্থা ক্যানসার রিসার্চ ইউকের নতুন প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক মারিয়াম জামাল-হাঞ্জানি। ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর আগে ২০১৭ সাল থেকে এ পদে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক চার্লস সোয়ানটন।
অধ্যাপক মারিয়াম জামাল-হাঞ্জানি একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও বক্ষসংক্রান্ত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ। তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ক্যানসার ইনস্টিটিউটে ক্যানসার জিনোমিকস ও মেটাস্ট্যাসিস বিষয়ে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্যানসার কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে—এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তার গবেষণা।
নতুন দায়িত্বে তিনি ক্যানসার রিসার্চ ইউকের চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন। রোগীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়গুলো নির্ধারণ, চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং গবেষণার ফলাফল বাস্তবে রোগীদের চিকিৎসায় কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। পাশাপাশি চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় নতুন কর্মী তৈরি এবং ব্রিটেন ও আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে সংস্থাটির প্রতিনিধিত্ব করবেন।
ক্যানসার রিসার্চ ইউকের প্রধান নির্বাহী মিশেল মিচেল বলেন, অধ্যাপক মারিয়ামের গবেষণা ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ক্যানসার কীভাবে বৃদ্ধি পায়, ছড়িয়ে পড়ে, চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং কখনো কখনো চিকিৎসার পর আবার ফিরে আসে—এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধারণা দিয়েছে। রোগীর অসুস্থতার বিভিন্ন পর্যায়ে টিউমার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তার গবেষক দল ক্যানসারের পরিবর্তনশীল আচরণ সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা তৈরি করতে সহায়তা করেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির কারণে ক্যানসার গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক মারিয়ামের বৈজ্ঞানিক দক্ষতা, নেতৃত্ব, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা সংস্থাটির ভবিষ্যৎ গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
অধ্যাপক মারিয়াম জামাল-হাঞ্জানি ফুসফুসের ক্যানসার কীভাবে বিকশিত হয়, তা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বিস্তৃত গবেষণা প্রকল্প ট্রেসারএক্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ গবেষণায় টিউমারের বিভিন্ন অংশ বিশ্লেষণ এবং রোগ নির্ণয়ের পর থেকে রোগীদের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ক্যানসারের পরিবর্তন ও বিকাশ বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ শনাক্ত করা এবং প্রতিটি রোগীর জন্য আরও উপযোগী চিকিৎসা নির্ধারণে সহায়তা করা।
এ ছাড়া পিস নামের একটি জাতীয় গবেষণা কর্মসূচিতে তার নেতৃত্ব ক্যানসার কীভাবে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসাকে অকার্যকর করে তোলে, সে বিষয়ে গবেষণাকে এগিয়ে নিয়েছে। উন্নত পর্যায়ের ক্যানসারে আক্রান্ত যেসব ব্যক্তি মৃত্যুর পর গবেষণার জন্য নিজেদের নমুনা দান করেন, তাদের সহায়তায় এই কর্মসূচিতে রোগের শেষ পর্যায়ের পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
ক্যানসার গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রয়্যাল সোসাইটি অব মেডিসিনের সিলভিয়া ললার বৈজ্ঞানিক পুরস্কার, অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যানসার ফিজিশিয়ানসের ম্যাকএলওয়েইন পুরস্কার এবং ক্যানসার রিসার্চ ইউকের ট্রান্সলেশনাল ক্যানসার রিসার্চ পুরস্কার। সম্প্রতি ক্যানসারের বিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক একটি দলের অংশ হিসেবে তিনি প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ইউরোর ইউরোপীয় গবেষণা পরিষদের সিনার্জি অনুদানপ্রাপ্ত গবেষণা উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন।
ক্যানসার রিসার্চ ইউকের নতুন প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মারিয়ামের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তারিতভাবে ক্যানসার পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং আরও নির্দিষ্ট ও কার্যকর চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ বাড়ছে।
তবে এসব অগ্রগতির সুফল এখনো সব রোগীর কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। অনেক রোগীর ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার পর শনাক্ত হচ্ছে। কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগীদের বেঁচে থাকার হারও এখনো কম। এ ছাড়া ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণের সুযোগ একেক এলাকায় একেক রকম এবং চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় কর্মীর সংকটও বাড়ছে।
অধ্যাপক মারিয়াম বলেন, ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএস গবেষণার ফলাফল সরাসরি রোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়া এবং গবেষণার আবিষ্কারকে উন্নত ক্যানসার চিকিৎসায় রূপান্তরের গতি বাড়াতে চান।
ক্যানসার রিসার্চ ইউকের সাবেক প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা এবং ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল পরিচালক অধ্যাপক চার্লস সোয়ানটনও তার নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অধ্যাপক মারিয়াম একজন দক্ষ ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এনএইচএসের মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে ক্যানসার গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।
সূত্রঃ ক্যানসার রিসার্চ ইউকে
এমকে

