যুক্তরাজ্যের ২০২৬ সালের স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদলের আভাস পাওয়া গেছে। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসজুড়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।
দলটি বহু কাউন্সিল, হাজারো কাউন্সিলর এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘাঁটি হারিয়েছে। একই সঙ্গে ডানপন্থি অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে নাটকীয় উত্থান ঘটিয়ে ইংল্যান্ডের একাধিক কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং স্কটিশ পার্লামেন্টেও প্রথমবারের মতো আসন জিতেছে।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটেনের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন পাঁচটি বড় শক্তির মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পুরো গ্রেট ব্রিটেনে জাতীয় নির্বাচন হলে লেবার কিংবা কনজারভেটিভ—কোনো দলই ২০ শতাংশের বেশি ভোট পেত না।
রিফর্ম ইউকে এখনও ভোটে এগিয়ে থাকলেও গত বছরের তুলনায় তাদের ভোট কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে গ্রিন পার্টির ভোট বেড়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
ওয়েলশ পার্লামেন্ট সেনেডে এবার সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জাতীয়তাবাদী দল প্লেইড কামরি। দলটি ৪৩টি আসন জিতলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে রিফর্ম ইউকে, যারা পেয়েছে ৩৪টি আসন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ওয়েলশ লেবার। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো ওয়েলসে নির্বাচনে পরাজয়ের মুখ দেখেছে দলটি। শুধু আসন হারানোই নয়, দলটির নেতা ও ফার্স্ট মিনিস্টার এলুনেড মরগানও নিজের আসন হারিয়েছেন। লেবার শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়েছে।
এ নির্বাচনে ওয়েলশ পার্লামেন্টের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়। আসন সংখ্যা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৯৬ করা হয়েছে। আগের আসন ও আঞ্চলিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ১৬টি নতুন নির্বাচনী এলাকা গঠন করা হয়েছে, যেখানে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
স্কটল্যান্ডে অধিকাংশ ফল ঘোষণার পরও স্বাধীনতাপন্থি স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দলটির নেতা জন সুইনি নিজের পার্থশায়ার নর্থ আসন ধরে রেখেছেন।
যদিও স্কটিশ লেবার সারা দেশে প্রায় ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছে, তবুও খুব কম আসন জিততে পেরেছে। অন্যদিকে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েও নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শক্ত অবস্থানের কারণে গ্রিন পার্টি দুটি আসন নিশ্চিত করেছে।
রিফর্ম ইউকে স্কটল্যান্ডেও প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছে, যা দেশটির রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ইংল্যান্ডে লেবার ৩০টির বেশি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিল, যা টানা ১৪ বছর ধরে লেবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন সেখানে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এবং পাঁচটি দলের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের স্যান্ডওয়েল ও বার্নসলের মতো শক্ত ঘাঁটিও রিফর্ম ইউকের কাছে হারিয়েছে লেবার। এছাড়া কিছু কাউন্সিল কনজারভেটিভ ও গ্রিন পার্টির কাছেও গেছে।
রিফর্ম ইউকে সান্ডারল্যান্ড, থারক, সাফোক, এসেক্স, হ্যাভারিং ও নিউক্যাসল-আন্ডার-লাইমসহ এক ডজনের বেশি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। দলটি দেশজুড়ে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি কাউন্সিলর নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রিন পার্টি নরউইচ, হ্যাকনি, ওয়ালথাম ফরেস্ট ও হেস্টিংস কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। গ্রিন পার্টি এবার কয়েকশ নতুন কাউন্সিলরও পেয়েছে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটরাও ওয়েস্ট সারে, ইস্ট সারে, পোর্টসমাউথ ও স্টকপোর্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। যদিও তারা হল কাউন্সিল হারিয়েছে।
কনজারভেটিভ পার্টিও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। দলটি ৫০০-এর বেশি আসন এবং ছয়টি কাউন্সিল হারিয়েছে। তবে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
রাজধানী লন্ডনেও লেবারের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। দলটি আটটি কাউন্সিল ধরে রাখতে পারলেও আরও আটটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
কনজারভেটিভরা এখন ছয়টি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা তিনটি কাউন্সিল ধরে রেখেছে।
গ্রিন পার্টি এখন দুটি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি হ্যাকনি ও লুইশামের মেয়র পদও তাদের দখলে গেছে।
রিফর্ম ইউকে হ্যাভারিং কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজধানীতেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ব্রিটেনের প্রচলিত দুইদলীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিবাসন, অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষ—সব মিলিয়ে ভোটাররা এবার নতুন বিকল্পের দিকে হাত বাড়িয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

