যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কর্মীদের অনির্দিষ্টকালীন বসবাসের অনুমতি বা আইএলআর (ILR) পাওয়ার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে লেবার সরকারের ভেতরেই তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭৮ জন এমপি একটি সংসদীয় প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন, যার মধ্যে ৪৩ জন লেবার এমপি।
লেবার এমপি নিল ডানকান-জর্ডানের উত্থাপিত প্রস্তাবে সরকারকে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা স্কিলড ওয়ার্কার ভিসাধারীদের জন্য পাঁচ বছরের আইএলআর পথ বহাল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংসদীয় নথিতে বলা হয়েছে, এসব কর্মী যুক্তরাজ্যে এসে কর প্রদান, অর্থনীতি ও জনসেবায় অবদান রাখছেন এবং অনেকেই পাঁচ বছর কাজ ও বসবাসের পর স্থায়ী হওয়ার প্রত্যাশায় নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ ব্যবস্থায় অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের সাধারণ যোগ্যতার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় যারা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে বেশি অবদান রাখবেন, তাদের জন্য অপেক্ষার সময় তুলনামূলকভাবে কম রাখা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের কিছু কর্মী তিন বছরেই স্থায়ী বসবাসের যোগ্য হতে পারেন। চিকিৎসক, শিক্ষক ও নার্সদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীদের জন্য পাঁচ বছরের পথ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে কম বেতনের বিদেশি কর্মী, বিশেষ করে কেয়ার খাতে কর্মরতদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অভিবাসীদের ওপর নতুন নিয়ম প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে। বিরোধী এমপিদের পাশাপাশি লেবার দলের ভেতরের সমালোচকদের আশঙ্কা, মানুষ যে নিয়মের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে এসে জীবন ও কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন, পরে সেই নিয়ম পরিবর্তন করলে তাদের প্রতি অন্যায় হবে।
নিল ডানকান-জর্ডান সতর্ক করেছেন, বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কারদের ক্ষেত্রে নিয়ম পরিবর্তন করা হলে তা বড় ধরনের ‘উইন্ডরাশ-ধাঁচের কেলেঙ্কারি’র জন্ম দিতে পারে। তার যুক্তি, কেয়ার হোম, রেলওয়ে কিংবা চিকিৎসা খাতে কর্মরত বহু মানুষ যুক্তরাজ্যে এসেছেন এই প্রত্যাশায় যে নির্দিষ্ট সময় কাজ ও বসবাসের পর তারা স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পাবেন। মাঝপথে সেই শর্ত পরিবর্তন করা হলে তা অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য ও টেকসই করাই সংস্কারের উদ্দেশ্য। যেসব অভিবাসী যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, জনসেবা ও সমাজে বেশি অবদান রাখবেন, তাদের দ্রুত স্থায়ী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে নতুন কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রী আনা টার্লি জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এখনো নীতিটির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করছেন। বিশেষ করে কেয়ার খাতে কর্মরতদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলক কম বেতনের কর্মীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হবে কি না, সে বিষয়েও সরকারের কাছে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মতামত এসেছে।
সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ করেছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য সাধারণ যোগ্যতার সময় ১০ বছর করার সংস্কার গত নভেম্বরে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং যারা যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন, তাদের জন্য অপেক্ষার সময় কম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলতি শরতে প্রকাশ করার কথা।
এই পরিস্থিতিতে ৭৮ জন এমপির সমর্থন পাওয়া প্রস্তাবটি লেবার সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ৪৩ জন লেবার এমপির সরাসরি সমর্থন দেখাচ্ছে যে আইএলআর সংস্কার নিয়ে সরকারের ভেতরেই মতবিরোধ যথেষ্ট গভীর।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন হলো—সরকার কি ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা স্কিলড ওয়ার্কারদের জন্য আগের পাঁচ বছরের স্থায়ী বসবাসের পথ বহাল রাখবে, নাকি নতুন ১০ ও ১৫ বছরের কাঠামো তাদের ক্ষেত্রেও কার্যকর করবে। শরতে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেই এর উত্তর মিলবে।
সূত্রঃ মিরর পলিটিক্স
এম.কে

