যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কর্মীদের স্পনসর করা একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের জন্য হোম অফিস কোনো বাধ্যতামূলক আইনি কারণ প্রযোজ্য মনে করলেও, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগের বিষয়ে জানানো এবং ব্যাখ্যা দেওয়ার যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেওয়া সাধারণত প্রয়োজন।
মামলাটি হলো R (Moon Fish Ltd) v Secretary of State for the Home Department, [2026] EWHC 2289 (Admin)। ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের হাইকোর্টের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কোর্ট এই রায় দেয়।
মুন ফিশ লিমিটেডের স্পনসর লাইসেন্সের আওতায় তিনজন বিদেশি কর্মী কাজ করছিলেন। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর হোম অফিস প্রতিষ্ঠানটির কাছে কর্মীদের চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত বিভিন্ন নথি চায়। হোম অফিসের উদ্বেগ ছিল, কর্মীরা তাদের সার্টিফিকেট অব স্পনসরশিপে উল্লেখ করা বেতন অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাচ্ছেন কি না।
মুন ফিশ ৩ নভেম্বর চাওয়া নথিপত্র জমা দেয়। নথি বিশ্লেষণের পর হোম অফিস দেখতে পায়, একজন কর্মী মে ও জুন ২০২৫ সময়ে তার নির্ধারিত বেতনের তুলনায় কম অর্থ পেয়েছেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, কম পাওয়ার কারণ ছিল ওই কর্মীর ২৭ এপ্রিল থেকে ২২ জুন পর্যন্ত অনুমোদিত বিনা বেতনের ‘কমপ্যাশনেট লিভ’ বা বিশেষ পারিবারিক কারণে ছুটি। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ওই ছুটি নেওয়া এবং সেই কারণে কম বেতন পাওয়া নিজের মধ্যে কর্মসংস্থান আইন বা স্পনসরশিপ ব্যবস্থার নিয়ম লঙ্ঘন ছিল না।
তবে ওই বেতন হ্রাসের বিষয়টি হোম অফিসকে জানানো হয়নি। মুন ফিশ পরে স্বীকার করে যে রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে ভুল হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য ছিল, এটি ছিল অনিচ্ছাকৃত ভুল।
হোম অফিস অবশ্য কর্মীর কম বেতন পাওয়ার কারণ জানতে মুন ফিশকে আর কোনো প্রশ্ন করেনি। ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে কোনো অতিরিক্ত যোগাযোগ ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির স্পনসর লাইসেন্স তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়। হোম অফিস অ্যানেক্স সি১(এএ)-এর ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই বিধানে সার্টিফিকেট অব স্পনসরশিপে উল্লেখ করা বেতনের চেয়ে কম বেতন দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন হোম অফিসকে না জানানোর বিষয়টি স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের বাধ্যতামূলক কারণ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
লাইসেন্স বাতিলের পর মুন ফিশ আইনি পদক্ষেপ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তি দেয়, লাইসেন্স বাতিলের আগে হোম অফিস তাদের উদ্বেগের বিষয়টি যথেষ্ট স্পষ্টভাবে জানায়নি এবং কম বেতন দেওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করার সুযোগও দেয়নি।
হাইকোর্ট এই যুক্তি গ্রহণ করে। আদালত বলেছে, স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি ও গুরুতর প্রভাব ফেলে। তাই সাধারণ আইনের অধীনে প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতার দায়িত্ব প্রযোজ্য। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসততা বা গুরুতর নিন্দনীয় আচরণের অভিযোগ না থাকলেও এই ন্যায্যতার দায়িত্ব বাতিল হয়ে যায় না।
আদালতের মতে, সাধারণভাবে হোম অফিসকে স্পনসরকে তাদের উদ্বেগের মূল বিষয় জানাতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য বা ব্যাখ্যা দেওয়ার যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দিতে হবে। শুধু কোনো বিষয়কে ‘বাধ্যতামূলক’ লাইসেন্স বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—এমন অবস্থাও এই প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতার প্রয়োজনীয়তা দূর করে না।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লাইসেন্স বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে লঙ্ঘন এতটাই স্পষ্ট যে ব্যাখ্যা চাওয়ার কোনো বাস্তব উদ্দেশ্য নেই। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি বিরল হওয়া উচিত এবং এমন ব্যতিক্রম দেখিয়ে সাধারণভাবে প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতার নিয়ম বাদ দেওয়া যায় না।
মুন ফিশের মামলায় আদালত দেখতে পায়, হোম অফিস যদি আগে কর্মীর কম বেতন পাওয়ার কারণ জানতে চাইত, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাখ্যা করতে পারত যে ওই কর্মী অনুমোদিত বিনা বেতনের ছুটিতে ছিলেন। আদালতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ব্যাখ্যা জানা থাকলে বিষয়টি শুধু একটি রিপোর্টিং লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারত এবং স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করা উচিত কি না, সে বিষয়ে হোম অফিসের সামনে ভিন্ন সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকত।
আদালত আরও উল্লেখ করেছে, স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের পরিণতি শুধু কোম্পানির ওপর পড়ে না; সংশ্লিষ্ট অভিবাসী কর্মীদের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। লাইসেন্স বাতিল হলে স্পনসর কর্তৃক দেওয়া সার্টিফিকেট অব স্পনসরশিপ বাতিল হতে পারে এবং কর্মীদের যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতিও পরবর্তী সময়ে শেষ হয়ে যেতে পারে।
রায়ের ফলে মুন ফিশের বিরুদ্ধে হোম অফিসের আগের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে এবং বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে ফেরত যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। ফ্রি মুভমেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের সিদ্ধান্তটি স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের ক্ষেত্রে হোম অফিসের প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতার দায়িত্বের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।
তবে এই রায়ের অর্থ স্পনসরদের রিপোর্টিংয়ের দায়িত্ব বাতিল বা শিথিল হয়ে যাওয়া নয়। স্পনসরদের কর্মীদের বেতন, চাকরির শর্ত এবং স্পনসরশিপ-সংক্রান্ত পরিবর্তন সম্পর্কে হোম অফিসকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব বহাল রয়েছে। মুন ফিশের মামলাতেও প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছিল যে অনুমোদিত দীর্ঘ ছুটির বিষয়টি যথাযথভাবে রিপোর্ট করা হয়নি।
যুক্তরাজ্যের স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় হোম অফিসের অ্যানেক্স সি১-এ কিছু পরিস্থিতিকে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স বাতিলের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে অ্যানেক্স সি২-এ এমন কিছু পরিস্থিতি রয়েছে, যেগুলো সাধারণত লাইসেন্স বাতিলের দিকে নিয়ে যেতে পারে, আর অ্যানেক্স সি৩-এ এমন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
মুন ফিশ মামলার রায়ে তাই একদিকে স্পনসরদের নিয়ম মেনে রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব বহাল রাখা হয়েছে, অন্যদিকে লাইসেন্স বাতিলের মতো গুরুতর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগ সম্পর্কে জানানো ও জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট
এম.কে

