ব্রিটেনে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার নিয়মে প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাস ও কাজ করা অভিবাসীরা। তাদের আশঙ্কা, ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বৈধ বসবাসের মাধ্যমে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ বাতিল করা হলে অনেককে ব্রিটেন ছাড়তে হতে পারে। এতে পরিবার পুনর্মিলনের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবনও অনিশ্চয়তায় পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্টে জন্ম নেওয়া ৩২ বছর বয়সী জুলিয়ান গ্রান্ট ১৮ বছর বয়সের পর স্কটল্যান্ডে চলে আসেন। ২০১২ সালে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়তে ব্রিটেনে আসেন এবং পরে পিএইচডি করতে ২০১৭ সালে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১০ বছর বৈধভাবে বসবাসের শর্ত পূরণ করায় আগামী বছর তার স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আবেদন করার যোগ্যতা তৈরি হওয়ার কথা।
সরকার ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পথ বাতিলের প্রস্তাব দেওয়ার পর থেকে গ্রান্ট নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ব্রিটেনেই তার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন, পেশাগত ক্যারিয়ার ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এত বছর ধরে স্থায়ী হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করার পর নিয়ম পরিবর্তন হলে তাকে আবার শুরু থেকে সবকিছু ভাবতে হবে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন ছাড়তে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তিনি।
গ্লুচেস্টারে বসবাসকারী আইটি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের কর্মী সামি—ইতোমধ্যে স্ত্রী ও শিশুকন্যার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দক্ষ কর্মী ভিসার নিয়ম পরিবর্তনের পর তার চাকরিকে ‘দক্ষ’ থেকে ‘মাঝারি দক্ষ’ হিসেবে পুনর্বিন্যাস করা হয়। ফলে ওই ভিসার আওতায় পরিবারের সদস্যদের ব্রিটেনে রাখার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবারের ভিসার জন্য প্রায় ১২ হাজার পাউন্ড খরচ করার পরও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামির স্ত্রী ও মেয়েকে ভারতে ফিরে যেতে হয়। আগামী বছর স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের পর পরিবারকে আবার ব্রিটেনে ফিরিয়ে আনার আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পথ বাতিলের প্রস্তাব তার সেই পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। সামি বলেন, তার স্ত্রী ব্রিটেনের জন্য অনেক অবদান রেখেছেন এবং কোভিড-১৯ টিকাদান কার্যক্রমে দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন। তিনি চান তার মেয়েও ব্রিটেনে বড় হোক।
২৬ বছর বয়সী সুয়েনি মাদান স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করে স্কটল্যান্ডে থেরাপি বিষয়ে ডক্টরাল পড়াশোনা শুরু করতে যাচ্ছেন। গত পাঁচ বছর ধরে ব্রিটেনে স্থায়ী হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি নিজের শিক্ষা ও পেশাগত পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। তবে থেরাপি পেশার অনেক কাজ স্বাধীনভাবে করতে হয় বলে তার জন্য দক্ষ কর্মী ভিসা পাওয়া কঠিন হতে পারে। মাদান বলেন, স্থায়ী হওয়ার একমাত্র পথ যদি দক্ষ কর্মী ভিসা হতো, তাহলে তিনি নিজের ক্যারিয়ার অন্যভাবে পরিকল্পনা করতেন। শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ করার পর এখন তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
নাইজেরিয়া থেকে ২০১৭ সালে ব্রিটেনে আসা ২৬ বছর বয়সী ইব্রাহিম—বর্তমানে লন্ডনের একটি জিপি সার্জারিতে ক্লিনিক্যাল প্রশাসক হিসেবে কাজ করছেন। পড়াশোনার সময় তিনি কোভিড-১৯ পরীক্ষাগার ও এনএইচএসের হাসপাতালে কাজ করেছেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনে বসবাসকারী অভিবাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, কর্মজীবন ও সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। স্থায়ী হওয়ার মাত্র কয়েক মাস আগে নতুন নিয়মের কারণে কারও আবেদন করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া দুঃখজনক হবে বলে তিনি মনে করেন।
৩৯ বছর বয়সী ডানা—নিজের পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন—বলেছেন, স্থায়ী বসবাসের নিয়ম নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তিনি উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিজ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধের কারণে তিনি দীর্ঘদিন সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিলেন। ছয় বছরের সঙ্গীর সঙ্গে বিয়ের পরিকল্পনাও পিছিয়ে রেখেছেন, কারণ তার নিজ দেশের নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী একজন অমুসলিম পুরুষকে বিয়ে করলে নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ডানা বলেন, তারা সব নিয়ম মেনেই ব্রিটেনে বসবাস করেছেন। তাহলে এখন কেন তাদের শাস্তি পেতে হবে, সেই প্রশ্নই তার মনে ঘুরছে।
ব্রিটেনে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের মাধ্যমে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নিয়ে কাজ করা লং রেসিডেন্স অ্যাডভোকেসি গ্রুপের এক মুখপাত্র জানান, তাদের প্রতিনিধিত্বে ৫৫০ জনেরও বেশি মানুষ রয়েছেন। প্রস্তাবগুলো বর্তমান অবস্থায় কার্যকর হলে এত বছর ধরে ব্রিটেনে বসবাসের সময়কে শূন্য থেকে গণনা করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অন্তত ছয় বছর ধরে ব্রিটেনে বসবাসকারীদের জন্য বিদ্যমান নিয়মে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ রেখে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পথ বাতিলের প্রস্তাব এখনো কার্যকর হয়নি এবং সরকারও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। আবাসনবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার ব্রিটেনে আগে থেকেই থাকা বিদেশি কর্মীদের ওপর নতুন নিয়ম প্রয়োগের পরিকল্পনাকে ‘ব্রিটিশ মূল্যবোধের পরিপন্থী’ বলে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ লেবার পার্টির সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগে থেকেই ব্রিটেনে থাকা অভিবাসীদের ওপর প্রস্তাবিত পরিবর্তন প্রয়োগের বিষয়টি কিছুটা শিথিল করা হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, গত বছরের নভেম্বরে সরকার এমন সংস্কারের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিল, যার লক্ষ্য স্থায়ী বসবাসকে স্বয়ংক্রিয় অধিকার না রেখে অর্জন করতে হয়—এমন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। এসব সংস্কারের কয়েকটি দিক নিয়ে পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে।
সূত্রঃ দ্য আই পেপার
এমকে

