26.8 C
London
June 25, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

৩৫ ডিগ্রি তাপে ওয়ার্ডে রোগীদের দুর্ভোগ—চরম গরমে নড়বড়ে ব্রিটেনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

যুক্তরাজ্যে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (এনএইচএস)-এর ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করেছে। চরম গরমে এমআরআই স্ক্যানার, রেডিওথেরাপি মেশিন, কুলিং ইউনিট এবং আইটি সার্ভার বিকল হয়ে যাওয়ায় ইংল্যান্ডের একাধিক হাসপাতাল ‘ক্রিটিক্যাল ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ বৃদ্ধি, ওয়ার্ডে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের চরম কর্মপরিবেশ স্বাস্থ্যখাতের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাপপ্রবাহের কারণে বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে পানিশূন্যতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং তাপজনিত অসুস্থতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। জরুরি বিভাগে এসব রোগীর ভিড় বাড়ার পাশাপাশি হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

একজন চিকিৎসক বলেন, “অনেক বয়স্ক রোগী অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা পানিশূন্যতার কারণে হাসপাতালে আসছেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ওয়ার্ডের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। অধিকাংশ স্থানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই, ফলে রোগী ও কর্মী উভয়েই চরম কষ্টে আছেন।”

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু জেরিয়াট্রিক ওয়ার্ডে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। এমনকি যেসব ওয়ার্ডে এয়ার কন্ডিশনিং রয়েছে, সেখানেও যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় কিছু ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই বেড়েছে যে কয়েকটি এনএইচএস ট্রাস্ট সরাসরি ‘ক্রিটিক্যাল ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা করেছে। এক হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, একাধিক বিভাগে যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে যাওয়ার পর জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। পরীক্ষাগার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত দুটি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর মেশিন অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালের আইটি সার্ভারও অতিরিক্ত গরম হয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। সম্ভাব্য তথ্য হারানোর আশঙ্কায় কর্মীদের অপ্রয়োজনীয় কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং আলো পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল।

দক্ষিণ ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথে অবস্থিত কুইন আলেকজান্দ্রা হাসপাতালও তাপপ্রবাহজনিত সংকটে ‘ক্রিটিক্যাল ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা করে। হাসপাতালের কুলিং ইউনিট বিকল হয়ে যাওয়ায় ডিজিটাল সিস্টেম, অপারেশন থিয়েটার, কার্ডিয়াক ক্যাথেটার ল্যাব এবং ডায়াগনস্টিক স্ক্যানিং সুবিধা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

পোর্টসমাউথ হসপিটালস ইউনিভার্সিটি এনএইচএস ট্রাস্টের ডেপুটি চিফ এক্সিকিউটিভ মার্ক অরচার্ড বলেন, “বর্তমান তাপপ্রবাহের অভূতপূর্ব চাপ এবং একাধিক চিলার ইউনিট বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের অনেক সেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে নরফোকে। নরফোক অ্যান্ড নরউইচ ইউনিভার্সিটি হসপিটালস এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট জানিয়েছে, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে কুলিং সিস্টেম অকার্যকর হয়ে পড়ায় তাদের কোনো এমআরআই স্ক্যানারই সচল নেই। এর ফলে শত শত রোগীর নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করতে হয়েছে।

এদিকে লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের কারণে একদিনে তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক জীবন-সংকটাপন্ন জরুরি কল রেকর্ড হয়েছে। বুধবার মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৬৪২টি ক্যাটাগরি-ওয়ান জরুরি কলের সাড়া দিতে হয়েছে তাদের, যা পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এসব কলের মধ্যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অন্যান্য প্রাণঘাতী জরুরি পরিস্থিতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের ক্লিনিক্যাল ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডা. হিলারি উইলিয়ামস বলেন, চলমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে তীব্র তাপপ্রবাহ মোকাবিলার জন্য এনএইচএস পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নয়।

তিনি বলেন, “রোগীরা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে চিকিৎসা নিচ্ছেন, আর মেশিন, পরীক্ষাগার ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেবায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এগুলো নিরাপদ চিকিৎসাসেবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু রোগীদের ওপর নয়, স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও গভীরভাবে পড়ছে। ঘুমের অভাব, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অস্বস্তিকর পরিবেশ কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।

ডা. উইলিয়ামসের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং এটি নতুন বাস্তবতা। তাই হাসপাতালগুলোকে ভবিষ্যতের চরম আবহাওয়া মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ জানিয়েছে, সব এনএইচএস ট্রাস্টকে চরম গরম মোকাবিলার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভাগটির দাবি, রোগীদের সুরক্ষা এবং বাড়তি চাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। পুরোনো হাসপাতাল ভবনের সংস্কার, আধুনিক কুলিং ব্যবস্থা স্থাপন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া ভবিষ্যতে এমন সংকট আরও ঘন ঘন এবং ভয়াবহ আকারে ফিরে আসতে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

গাজায় মাহাথির মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল ধ্বংস করল ইসরাইল

অস্ট্রেলিয়ায় যেতে ইচ্ছুকদের জন্য দুঃসংবাদ

সৌদির পারমাণবিক অস্ত্র আছে, আর যুক্তরাষ্ট্রও এটা জানেঃ ইরানের সাবেক কমান্ডার