TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকফিচার

অস্ট্রেলিয়ার সংগীত তালিকায় নিষিদ্ধ এআই-নির্ভর গান

অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সংগীতের তালিকায় এখন থেকে পুরোপুরি বা প্রধানত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি গান স্থান পাবে না। দেশটির সংগীতশিল্পীদের সৃষ্টিশীলতা ও মানবিক অবদান রক্ষায় নতুন এই নীতি চালু করেছে অস্ট্রেলিয়ান রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তালিকায় জায়গা পেতে কোনো গানকে অবশ্যই মূলত মানুষের তৈরি হতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ার সংগীতের সরকারি তালিকা পরিচালনাকারী সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী এআইয়ের সহায়তা নেওয়া গান পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে গানের মূল সৃষ্টিশীল কাজ মানুষের হতে হবে। বিশেষ করে গান লেখা, প্রধান কণ্ঠ পরিবেশন এবং প্রধান বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি অবদান থাকতে হবে। এআইকে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলে সেই গান তালিকায় বিবেচিত হতে পারে।

সংস্থাটির হালনাগাদ নীতিমালা অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করা কোনো রেকর্ডিং তালিকায় যোগ্য হতে হলে সেটি ‘মূলত মানুষের তৈরি’ হওয়ার পাশাপাশি গানটির স্ট্রিম বা তালিকায় অবস্থান কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর কোনো সন্দেহ থাকা যাবে না। এআই ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও সেবার বৈধতা নিয়েও শর্ত রাখা হয়েছে।

আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর তালিকা, যা ২৮ আগস্ট প্রকাশিত হবে, সেই তালিকা থেকেই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। অর্থাৎ পুরোপুরি এআই দিয়ে তৈরি গান আর অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সংগীত তালিকায় প্রতিযোগিতা করতে পারবে না।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলীয় সংগীত প্রযোজক জশ ফাওয়াজের ম্যাডোনার বিখ্যাত গান ‘লাইক আ প্রেয়ার’-এর নতুন সংস্করণকে ঘিরে বিতর্ক। গানটি অস্ট্রেলিয়ার সংগীত তালিকায় ব্যাপক সাফল্য পায় এবং একপর্যায়ে সামগ্রিক একক গানের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ওঠে। পরে গানটিতে এআই-নির্ভর কণ্ঠ ও ড্রামের ব্যবহার সম্পর্কে ক্রেডিট যুক্ত করা হয়।

ফাওয়াজের গানটি দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ার সংগীতের শীর্ষ তালিকায় অবস্থান করায় এআই দিয়ে তৈরি বা এআই-সহায়তায় তৈরি সংগীতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম কতটা কার্যকর—তা নিয়ে সংগীতশিল্পী ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র আলোচনা শুরু হয়।

নতুন নীতিমালায় এআরআইএকে কোনো গান পরবর্তীতে অযোগ্য প্রমাণিত হলে সেটিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আগের তালিকায় গানটির অবস্থান পরিবর্তন করা, স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা কিংবা শীর্ষস্থান অর্জনের জন্য দেওয়া পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করা যেতে পারে। অযোগ্য ঘোষিত গান এআরআইএর পুরস্কারের জন্যও বিবেচিত হবে না।

তবে শিল্পীদের জন্য আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো গানকে এআই ব্যবহারের কারণে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে শিল্পী বা তার প্রতিনিধিরা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে গানটি যোগ্য—এমন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেন।

এআরআইএর প্রধান নির্বাহী অ্যানাবেল হার্ড বলেছেন, সংগীতশিল্পীরা ইতোমধ্যে তাদের কাজে এআইয়ের বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন এবং সংগীতের তালিকায় প্রযুক্তির এই ব্যবহারকে জায়গা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু শিল্পীদের রেকর্ডিং ব্যবহার করে তৈরি প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে এআই-নির্ভর গান তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

হার্ডের মতে, শিল্পীদের অনুমতি ছাড়া তৈরি এআই সংগীতকে যদি সরকারি সংগীত তালিকায় পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে তা রেকর্ডিং শিল্পের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করবে। তাই নতুন নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্য হলো সংগীতের বাজারে মানুষের সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতি বজায় রাখা।

অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সংগীত শিল্পেও এআই নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক রেকর্ডিং শিল্পের সংগঠন আইএফপিআই এআই ব্যবহার করে তৈরি সংগীতের ক্ষেত্রে মানুষের সৃষ্টিশীল অবদান, বৈধ এআই সেবা এবং কৃত্রিমভাবে স্ট্রিম বা তালিকার অবস্থান বাড়ানোর বিরুদ্ধে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার নতুন নিয়ম সেই আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও এআইয়ের কারণে সৃষ্টিশীল শিল্পীদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি লেখক ও সংগীতশিল্পীদের নিজেদের কাজ এআই প্রশিক্ষণে কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর সংগীত তালিকার নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এআই প্রযুক্তি দ্রুত সংগীত তৈরির প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়লেও মানুষের সৃষ্টিশীলতা, কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র ও মেধাস্বত্বের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। অস্ট্রেলিয়ার নতুন নিয়ম সেই বিতর্কে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

ইউরোপের সব দেশ থেকে কোকাকোলার পণ্য প্রত্যাহার

উত্তাল সিরিয়া, আরেক শহর দখলে নিলো বিদ্রোহীরা

ইয়েমেনে সম্মিলিত বিমান হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য