ইথিওপিয়া ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগের পাশাপাশি বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পে এগোচ্ছে ইথিওপিয়া। ইসরায়েলের সঙ্গে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে দুই দেশ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ইথিওপিয়া সফর করেন। সফরে তিনি ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট তাইয়ে আতসকে সেলাসি ও প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র সম্প্রসারণ নিয়ে এসব বৈঠকে আলোচনা হয়।
২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ ইথিওপিয়া-ইসরায়েল যৌথ রাজনৈতিক পরামর্শ বৈঠক। সেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়।
ইথিওপিয়ার উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর একটি হয়ে উঠেছে গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধ। দেশটির দাবি, বাঁধটি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সরবরাহের ৫২ শতাংশের বেশি জোগান দিচ্ছে। পাশাপাশি জিবুতি, কেনিয়া ও সুদানে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ সুদান ও তানজানিয়ার সঙ্গেও বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি হয়েছে।
ব্লু নাইল নদীতে আরও তিনটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে ইথিওপিয়া। একই সঙ্গে ওমো নদীর ওপর কোয়েশা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই প্রকল্প ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বড় জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্মিলিত মূল্যমানের নতুন মেগা প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছে ইথিওপিয়া। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বড় বিমানবন্দর, প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সার কারখানা।
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস একটি নতুন বৃহৎ বিমানবন্দর নির্মাণ করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরটির প্রাথমিক বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৬ কোটি। এটি আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ বিমান পরিবহন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
সোমালি অঞ্চলে বাণিজ্যিক প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনও শুরু করেছে ইথিওপিয়া। একটি প্রকল্পে বছরে ১১ কোটি ১০ লাখ লিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন সার কারখানার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে ২০২৬ সালের ১ জুন ইথিওপিয়ায় সপ্তম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির জাতীয় নির্বাচন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অঞ্চল ও নগর প্রশাসনে ভোটার উপস্থিতি ৯৪ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে ছিল। প্রসপারিটি পার্টি অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় জয় পেয়ে সংসদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
দেশটিতে জাতীয় সংলাপ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইথিওপিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ কমিশনের আয়োজিত এই সম্মেলনে প্রায় ৪ হাজার মানুষ অংশ নেন। আটটি মৌলিক জাতীয় ইস্যু নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়।
পরিবেশ রক্ষায় ২০১৯ সালে শুরু করা গ্রিন লিগ্যাসি উদ্যোগও সম্প্রসারিত করছে ইথিওপিয়া। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশটির পার্লামেন্ট গ্রিন লিগ্যাসি উদ্যোগ এবং ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমি পুনর্বাসন বিশেষ তহবিল প্রতিষ্ঠার আইন অনুমোদন করে। এর আওতায় ভূমি পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় বাজেটের শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অর্থনীতিতেও প্রবৃদ্ধির দাবি করেছে ইথিওপিয়া। নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশটির জিডিপি ১০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। কফি রপ্তানি থেকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং স্বর্ণ রপ্তানি থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। তৈলবীজ, উদ্যানজাত পণ্য, গবাদিপশু ও বস্ত্রও রপ্তানিতে অবদান রেখেছে।
জুনের নির্বাচনের পর নতুন সরকার নিয়ে নতুন বছরে প্রবেশ করছে ইথিওপিয়া। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, জাতীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হর্ন অব আফ্রিকা ও লোহিত সাগর অঞ্চলের কূটনীতিতেও দেশটির ভূমিকা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য জেরুজালেম পোস্ট
এম.কে

