ভারতের কলকাতার তপসিয়া এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান্দ বানুকে নিয়ে বসবাস করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। দেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান করলেও তার জীবনযাপনে কোনো ধরনের আর্থিক সংকটের চিত্র নেই। নিয়মিত দামি শপিংমলে কেনাকাটা, বিলাসবহুল গাড়িতে চলাচল এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন তিনি।
বাংলাদেশে থাকা নানকের বিভিন্ন ব্যবসা ও সম্পত্তি থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি আয় হুন্ডির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে বলে ঘনিষ্ঠজন ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দাবি করেছেন। গত প্রায় দুই বছর ধরে এভাবে দেশে থাকা সম্পদের আয় ভারতে পাঠিয়ে নানক কলকাতায় বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
মেয়ে এস আমরিন রাখি ও তার স্বামী নানকের সঙ্গে একই বাসায় থাকেন না। তবে মাঝেমধ্যে তারা কলকাতার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেন। তপসিয়ার ফ্ল্যাট থেকেই দেশে দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং মাঝে মধ্যে ভিডিও বার্তা দেওয়ার কথা জানা গেছে।
পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতারও ওই বাসায় যাতায়াত রয়েছে। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সেখানে ডেকে সভা করার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে নানক পরিবারের সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর মিলিয়ে ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন নানক। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় তাদের সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় প্রায় ১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৬ বছরের ব্যবধানে হলফনামায় ঘোষিত সম্পদ প্রায় ৩০ গুণ বেড়েছে।
তবে হলফনামায় উল্লেখ করা সম্পদের বাইরে নানক পরিবারের আরও বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত মূল্য শত কোটি টাকার বেশি বলেও দাবি করা হয়েছে।
বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় নানক দম্পতির মালিকানাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়-ব্যয়ের হিসাবও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
বরিশালের প্রবেশদ্বার দোয়ারিকা সেতু এলাকায় থাকা প্রায় আট একর জমির তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বরিশাল নগরীতে দুইটি বাড়ি ও মাছের খামারসহ ২ একর ২২ শতাংশ ভূ-সম্পত্তির তথ্য থাকলেও এসব সম্পত্তিতে থাকা ছোট-বড় ভবন এবং সেগুলো থেকে পাওয়া ভাড়ার হিসাব উল্লেখ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকার কলাবাগান, কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় নানকের নামে বা বেনামে আরও বিপুল সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নানকের বরিশালের বিভিন্ন সম্পত্তিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। বটতলা এলাকার বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় হচ্ছে। রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের জমিতে থাকা বাড়ি থেকেও ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
এসব সম্পত্তি থেকে মাসে কোটিরও বেশি টাকা আয় হচ্ছে এবং সেই অর্থের বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে নানকের কাছে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বরিশাল নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ভারতে অর্থ পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তাদের একজন হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং অন্যজন স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নানকের বিভিন্ন সম্পত্তির ভাড়া সংগ্রহ করে ওই দুই ব্যক্তির কাছে দেওয়া হয়। পরে হুন্ডির মাধ্যমে সেই অর্থ পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় রুপিতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
নানকের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করা এক ব্যক্তি এই অর্থ লেনদেনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর নেওয়া ওই ব্যক্তি ৫ আগস্টের পর আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়লেও নানকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মীর দাবি, বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ সংগ্রহ করতে নানককে বাইরে যেতে হয় না। নির্ধারিত এজেন্টরা তপসিয়ার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে অর্থ পৌঁছে দিয়ে আসেন।
ওই ব্যক্তির ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর প্রায় দুই বছর ধরে তিনি এ ধরনের অর্থ লেনদেন দেখেছেন। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ওই অর্থ দিয়েই কলকাতায় নানক বিলাসী জীবনযাপন করছেন বলে তিনি দাবি করেছেন।
কলকাতার বিভিন্ন নামিদামি শপিংমলে নানক ও তার স্ত্রীকে নিয়মিত দেখা যায় বলেও দাবি করা হয়েছে। দামি গাড়িতে চলাচলসহ বিভিন্ন বিলাসী সুবিধা তারা ভোগ করছেন এবং এসব ব্যয়ের অর্থ বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীর কবির নানকের বক্তব্য জানতে তার পরিচিত একাধিক ফোন ও মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
সূত্রঃ যুগান্তর
এম.কে

