অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রকাশ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের একাধিক দেশ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই উদ্যোগে যোগ দেবে না বলে স্পষ্ট করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের নীতিগত দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই সেই পদক্ষেপ অনুসরণ করবে না। মিয়ামিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য কী ঘোষণা করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র দেখেছে; তবে ওয়াশিংটন একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে না।
রুবিওর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য মঙ্গলবার ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।
এই উদ্যোগে যুক্তরাজ্যের পাশে দাঁড়িয়েছে কানাডা, ফ্রান্স, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও সুইডেন। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যসহ মোট ১২টি পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে সমন্বিত নিষেধাজ্ঞার অবস্থান নিয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও কর্মকাণ্ডের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা। তাদের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞায় যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের চেয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে না, মার্কো রুবিও একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রুবিও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে এমনিতেই অনেক কিছু ঘটছে। এর মধ্যে পশ্চিম তীরে নতুন করে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হোক, তা যুক্তরাষ্ট্র চায় না। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞায় অংশ না নিলেও পশ্চিম তীরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন।
তবে সামগ্রিকভাবে এই পরিস্থিতি ফিলিস্তিন-ইসরায়েল প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে অবস্থানগত পার্থক্যকে সামনে এনেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে নিষেধাজ্ঞা থেকে দূরে থাকছে, অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের একাধিক দেশ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের পথে এগোচ্ছে।
পশ্চিম তীর আন্তর্জাতিকভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশ এই বসতি সম্প্রসারণকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইসরায়েলি বসতি ইস্যুতে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত দেখাচ্ছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এখনো ইউরোপীয় মিত্রদের চেয়ে আলাদা নীতি অনুসরণ করছে।
ফলে পশ্চিম তীরকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ বাড়াচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্র সেই নিষেধাজ্ঞায় যোগ না দিয়ে ইসরায়েলের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সমর্থনমূলক অবস্থান বজায় রাখছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন পশ্চিম তীরে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি না করার ওপর জোর দিচ্ছে।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ \ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

