দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তর্জাতিক বয়কট বা বর্জন প্রচারণার মুখে ২০২৫ সালে ইসরায়েলে ব্রাজিলের সরাসরি অপরিশোধিত তেল রফতানি সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ব্রাজিলের ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম এজেন্সির (এএনপি) পক্ষ থেকে জুন মাসের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত ২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যানগত বর্ষবইয়ের (স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইয়ারবুক) অফিশিয়াল তথ্যে এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৈশ্বিক স্তরে ইসরায়েলবিরোধী ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশনস’ (বিডিএস) আন্দোলন এই অর্জনকে তাদের দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত চাপ এবং প্রচারণার একটি বড় বিজয় হিসেবে দাবি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিডিএস আন্দোলন এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, সরাসরি তেল রফতানি বন্ধ হওয়াটা ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমানোর ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত অগ্রগতির লক্ষণ।
একইসঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সম্মিলিত চাপ সরকারকে তার আন্তর্জাতিক মানবিক বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে।
ক্লিন এনার্জি ক্যাম্পেইন গ্রুপ ‘অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্তও ব্রাজিল ছিল ইসরায়েলের পঞ্চম বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ, যা দেশটির মোট আমদানির প্রায় ৯ শতাংশ পূরণ করত। তবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে নাৎসিদের ইহুদি নিধনের সঙ্গে তুলনা করে গণহত্যার অভিযোগ তোলার পর দুই দেশের সম্পর্কে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়। সেই উত্তেজনার জেরে ইসরায়েল লুলা দা সিলভাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।
এ ধরনের তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝেই ২০২৪ সালের বাকি সময়ে ব্রাজিল কার্যত ইসরায়েলের চতুর্থ বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছিল। সে সময় ব্রাজিলের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাস বারবার দাবি করেছিল যে, তারা ইসরায়েলে সরাসরি কোনো তেলের চালান পাঠায়নি, বরং আন্তর্জাতিক শোধনাগারগুলোর কাছে তেল বিক্রি করেছে এবং সেই পরিশোধিত পণ্যের চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায় হবে, তার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যদিও সরাসরি পথটি বন্ধ হয়েছে, তবে তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে তেল পৌঁছানোর বিকল্প বা ‘পেছনের দরজা’ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে সতর্ক করেছেন আন্দোলনকারীরা।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম তেল শ্রমিক ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট লুলার ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কথা উল্লেখ করে একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা বা এম্বারগো জারির অনুরোধ জানিয়ে সরকারকে চিঠি দিলেও তার কোনো জবাব মেলেনি।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলাকে সমর্থন করে এবং তেল আবিব থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়।
বিডিএস আন্দোলন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, সরাসরি পথ বন্ধ হলেও ব্রাজিলের তেল যদি অন্য কোনো দেশের মাধ্যমে পুনরায় রফতানি হয়ে ইসরায়েলে পৌঁছায়, তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্রাজিল তার দায় এড়াতে পারে না। কারণ আইন অনুযায়ী, চালানের রুট বা পথ প্রধান বিষয় নয়, বরং জেনেশুনে এবং বস্তুগতভাবে সরবরাহে ভূমিকা রাখাই একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে। ফলে সরাসরি সরবরাহ বন্ধের এই সাফল্যকে প্রথম ধাপ হিসেবে ধরে নিয়ে তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে তেল সরবরাহ বন্ধ করতে তাদের চাপ অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
সূত্রঃ মিডল ইস্ট আই
এম.কে

