যুক্তরাজ্যে করদাতাদের অর্থে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক বা কনডম সরবরাহ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও জনমত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডেইলি এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের হোটেলগুলোতে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিনামূল্যে কনডম সরবরাহ করা হচ্ছে।
এনএইচএস ইংল্যান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক সেবা কেবল আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নয়; যুক্তরাজ্যে এনএইচএসের আওতাভুক্ত স্বাভাবিক যৌনস্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবেই এই সেবা দেওয়া হয়। যৌনস্বাস্থ্য ক্লিনিক, অধিকাংশ ফার্মেসি এবং কিছু জিপি প্র্যাকটিসের মাধ্যমে বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক পাওয়া যায়। আশ্রয়প্রার্থীরাও এই সাধারণ সেবার আওতাভুক্ত।
তবে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন ও জীবনযাপনের ব্যয় নিয়ে ব্রিটেনে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র, তখন হোটেলে থাকা ব্যক্তিদের বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক সরবরাহের বিষয়টি নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস ফিলপ এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, ব্রিটিশ করদাতারা অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারীদের জন্য গর্ভনিরোধকের ব্যয় বহন করছেন, অথচ অনেক ব্রিটিশ নাগরিক এনএইচএসে প্রয়োজনীয় ডেন্টাল চিকিৎসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে সমস্যায় পড়ছেন।
ফিলপ আরও দাবি করেছেন, বর্তমানে ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ করদাতাদের অর্থে সরকারি ব্যবস্থায় বসবাস করছেন এবং লেবার সরকারের অধীনে ছড়িয়ে দেওয়া আবাসনে থাকা মানুষের সংখ্যা ১২ শতাংশ বেড়েছে। তার বক্তব্য, অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারীদের দেশ থেকে ফেরত পাঠানোই সমস্যার সমাধান।
তিনি ভবিষ্যৎ কনজারভেটিভ সরকারের অধীনে অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আরও কঠোর নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তার মতে, ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিরা দেশটিতে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারবেন না—এমন বার্তা স্পষ্ট করা হলে ছোট নৌকায় করে আসার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।
করদাতাদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যালায়েন্সও এই বিষয়টির সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী জন ও’কনেল দাবি করেছেন, যুক্তরাজ্যের করদাতারা ইতোমধ্যে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের প্রক্রিয়াকরণ, আবাসন এবং বিভিন্ন সুবিধার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। তার বক্তব্য, যারা আইন ভঙ্গ করে সীমান্ত অতিক্রম করেন, তাদের জন্য করদাতা-অর্থায়িত সুবিধা থাকা উচিত নয়।
এর আগে ডেইলি এক্সপ্রেসের আরেকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ব্রিটিশ সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এমন তথ্যসম্বলিত প্রচারপত্র ব্যবহার করছে যেখানে বলা হচ্ছে—যুক্তরাজ্যে নারী ও পুরুষ সমান এবং নারীদের ধর্ষণ বা মারধর করা বেআইনি। শিশুদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কও যে বেআইনি, সে বিষয়েও তাদের জানানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এই বিষয়টিও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীদের অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী কনজারভেটিভ অ্যাসেম্বলি সদস্য সুসান হল বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক সরবরাহের সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, এনএইচএস যখন ইতোমধ্যে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে, তখন করদাতাদের অর্থ এ ধরনের খাতে ব্যয় করা নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারেন।
হলের মতে, আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার পুরো ব্যবস্থাই করদাতাদের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। তার দাবি, এই ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা আশ্রয় ব্যবস্থার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বর্তমান ব্যবস্থার অকার্যকারিতার বিষয়টি সামনে আনছে।
তবে এনএইচএসের অবস্থান ভিন্ন। এনএইচএসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক সেবা যুক্তরাজ্যের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার অংশ এবং এতে আশ্রয়প্রার্থীরাও অন্তর্ভুক্ত। যৌনস্বাস্থ্য ক্লিনিক, অধিকাংশ ফার্মেসি ও কিছু জিপি প্র্যাকটিসের মাধ্যমে এই সেবা দেওয়া হয়। এনএইচএস আইন অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে বলে মুখপাত্র জানিয়েছেন।
ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি ভিন্ন অবস্থান। একদিকে সরকার ও এনএইচএসের যুক্তি—আশ্রয়প্রার্থীরা যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অধিকারী এবং গর্ভনিরোধক সাধারণ যৌনস্বাস্থ্যসেবার অংশ। অন্যদিকে বিরোধী দল ও করদাতা অধিকারকর্মীদের প্রশ্ন—দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সরকারি ব্যয়ের ওপর যখন চাপ রয়েছে, তখন আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য করদাতাদের অর্থে এসব সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা কতটা।
বিশেষ করে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন, হোটেল ব্যয় এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় সরকারি ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে লেবার সরকার। সেই পরিস্থিতিতে বিনামূল্যে গর্ভনিরোধক সরবরাহের বিষয়টি অভিবাসন নীতি নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এম.কে

