যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের মাধ্যমে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে স্কাই নিউজ জানিয়েছে।
আদেশে স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাণিজ্য বিষয়ে কানাডার সঙ্গে আলোচনা করা ‘সবচেয়ে খারাপ’ অভিজ্ঞতা। কানাডা নিজেদের অধিকারপ্রাপ্ত মনে করে—এমন অভিযোগ তুলে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অবস্থান মেনে নিতে পারে না।
তবে নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ লেকটির একটি বড় অংশ কানাডার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে কানাডার ব্যবহৃত ভৌগোলিক নাম পরিবর্তন করতে পারেন না। ফলে ওয়াশিংটন ‘লেক আমেরিকা’ নাম ব্যবহার করলেও কানাডা আগের নাম ‘লেক অন্টারিও’ বহাল রাখতে পারে।
নাম পরিবর্তনের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহে কানাডা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। কানাডার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৭০০টি মার্কিন পণ্যে ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হবে।
এই তালিকায় ইস্পাত ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রয়েছে। কানাডার দাবি, ওয়াশিংটনের নতুন শুল্কের জবাব হিসেবেই এসব পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত সপ্তাহে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যায়। এরপর শনিবার ট্রাম্প প্রশাসন কানাডীয় পণ্যের ওপর পরিকল্পিত শুল্ক বৃদ্ধি কার্যকর করে। মদ, কাঠজাত পণ্য ও পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়।
বিরোধ আরও বাড়িয়ে সোমবার ট্রাম্প ইস্পাত, গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। নতুন এসব শুল্ক জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদারের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুল্ক নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ ও খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি জানান, অন্টারিও থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
ফোর্ড ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে একটি ব্যাটারি সঙ্গে রাখার পরামর্শও দিয়েছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুল্ক আরোপের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও শিল্প সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
লেক অন্টারিও দুই দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হ্রদটির উত্তর তীর কানাডার অন্টারিও প্রদেশে এবং দক্ষিণ তীর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে। টরন্টো ও বাফেলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর এই জলভাগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এর নাম পরিবর্তনের ঘোষণা কেবল প্রতীকী রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই নয়, দুই দেশের চলমান উত্তেজনার আরেকটি প্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এর আগে ট্রাম্প মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মেক্সিকো সেই নাম পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করেছিল। লেক অন্টারিওর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ভিন্ন ভিন্ন নামে একই জলভাগকে উল্লেখ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, শুল্ক আরোপ, পাল্টা শুল্ক, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকি এবং এবার গুরুত্বপূর্ণ একটি জলভাগের নাম পরিবর্তনের ঘোষণা—সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক বিরোধের পাশাপাশি প্রতীকী ও রাজনৈতিক পদক্ষেপও যুক্ত হওয়ায় দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ
এম.কে

