13 C
London
October 27, 2026
TV3 BANGLA
মানুষের তৈরি সফটওয়্যারের ত্রুটি সংশোধনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকা: সম্ভাবনা, ঝুঁকি ও ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
মুক্তমত

পিএইচপির ত্রুটি, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সূচনা?

নাশীত রহমান | লন্ডন | ২৭ অক্টোবর ২০২৬

 

পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। সরকারি প্রশাসন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, হাসপাতাল, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত যোগাযোগ—সবকিছুই এখন সফটওয়্যারনির্ভর। এই বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামোর অন্যতম ভিত্তি পিএইচপি (PHP), যা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অসংখ্য ওয়েবসাইট পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় পিএইচপির দুটি অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার সংবাদ বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গত ২১ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব ত্রুটি সংশোধনের জন্য জরুরি নিরাপত্তা আপডেট প্রকাশ করা হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইট ও গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি ওয়েবসাইটে PHP (Hypertext Preprocessor) প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহৃত হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সার্ভার-সাইড প্রোগ্রামিং ভাষা। ফেসবুকের প্রাথমিক সংস্করণ, উইকিপিডিয়া এবং ওয়ার্ডপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশে PHP উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট পিএইচপি নির্ভর হওয়ায় এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা, সফটওয়্যারের ত্রুটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কোড সংশোধনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিএইচপিতে কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তাগত দুর্বলতা দেখা দিলে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী অসংখ্য ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল সেবার ওপর পড়তে পারে।

যদি বাস্তবতা আমাদের ধারণার ঠিক বিপরীত হয়? যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যারের ত্রুটি আবিষ্কারের পরিবর্তে ত্রুটি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাকেই একদিন নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে? আরও সহজভাবে বললে, ভবিষ্যতে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করবে যে তাদের সফটওয়্যারে গুরুতর সমস্যা রয়েছে এবং সেই সমস্যা সমাধানের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রস্তাবিত পরিবর্তন গ্রহণ করতেই হবে, তাহলে কী ঘটতে পারে?

এটি নিছক একটি অনুমান, একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কল্পনা। বর্তমান পিএইচপি ঘটনার ক্ষেত্রে এমন কোনো ষড়যন্ত্র বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গোপন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং প্রকাশিত প্রযুক্তিগত গবেষণায় বাস্তব নিরাপত্তাত্রুটির বিবরণ রয়েছে। তবুও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, কোনো ব্যবস্থার ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতা একসময় সেই ব্যবস্থাকেই ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

দুই দশক ধরে যে ত্রুটি মানুষের চোখ এড়িয়ে গেল – পিএইচপি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা। ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রযুক্তি গত তিন দশকে অসংখ্য ওয়েবসাইট, সরকারি সেবা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। লাখ লাখ সফটওয়্যার প্রকৌশলী, প্রোগ্রামার ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে এর কোড পরীক্ষা করেছেন। নিয়মিত সংস্করণ পরিবর্তন হয়েছে, নিরাপত্তা আপডেট প্রকাশিত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে সফটওয়্যারটির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

অথচ ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় এমন দুটি গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর ভিত্তি বহু বছর ধরে সফটওয়্যারটির মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—এতদিন এত মানুষ যে সমস্যা শনাক্ত করতে পারেননি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে তা শনাক্ত করল? এর একটি যুক্তিসংগত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা রয়েছে। সফটওয়্যারের কোনো ত্রুটি বহু বছর অপ্রকাশিত থাকতে পারে। কোনো প্রোগ্রাম নিয়মিত কাজ করছে, তার অর্থ এই নয় যে সেটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত। বিশেষ পরিস্থিতিতে সক্রিয় হওয়া নিরাপত্তাত্রুটি সাধারণ ব্যবহারে কখনো প্রকাশ নাও পেতে পারে।

ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে ত্রুটি শনাক্ত করবে বলে দাবি করবে, সেটি প্রকৃত ত্রুটি কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা মানুষের থাকবে তো? ত্রুটি সংশোধনের নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব? একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা যাক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার পরীক্ষা করে ঘোষণা করল, সেখানে গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি রয়েছে।

সফটওয়্যারটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করেন। ব্যাংক, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, সরকারি প্রশাসন এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা এর ওপর নির্ভরশীল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জানাল, অবিলম্বে নিরাপত্তা আপডেট না করলে ভয়াবহ সাইবার হামলার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সফটওয়্যার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সেই আপডেট গ্রহণ করতে চাইবে। কিন্তু যদি ভবিষ্যতের কোনো অত্যন্ত উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার প্রস্তাবিত সংশোধনের মধ্যে এমন পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করে, যা পরবর্তী সময়ে তাকে গোপনে তথ্য সংগ্রহ, সফটওয়্যারের আচরণ পরিবর্তন অথবা নির্দিষ্ট ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়? সেক্ষেত্রে নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা আপডেটই নতুন নিরাপত্তাঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় ক্ষতিকর কোড, সরবরাহব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ এবং সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে আক্রমণের বাস্তব নজির রয়েছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজস্ব উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য পৃথক ও শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে চিন্তা করা এবং কোনো বিপদ ইতিমধ্যে ঘটেছে বলে দাবি করা এক বিষয় নয়।

মানুষ কি ধীরে ধীরে নিজের প্রযুক্তির ওপর কর্তৃত্ব হারাচ্ছে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। এটি সফটওয়্যার তৈরি করে, বিদ্যমান কোড বিশ্লেষণ করে, নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করে এবং জটিল প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করে। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুত বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে।

কিন্তু প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িত। যে ব্যবস্থা মানুষের তুলনায় দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে পারে, মানুষ কি একসময় সেই ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত যাচাই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে? ধরা যাক, ভবিষ্যতে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন জটিল সফটওয়্যার তৈরি করল, যার কার্যপদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে বুঝতে মানুষের কয়েক বছর প্রয়োজন। অথচ একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই সফটওয়্যার সংশোধন করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রস্তাবিত সংশোধন গ্রহণ করবে, নাকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করে নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের দিয়ে যাচাই করাবে? বাস্তব জীবনে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সম্ভবত দ্রুত সমাধানের পথই বেছে নেবে। এভাবে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে প্রযুক্তির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরতায় রূপ নিতে পারে। আর সেই পর্যায়ে প্রশ্ন উঠবে—প্রযুক্তি কি মানুষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, নাকি মানুষ প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে বাধ্য হচ্ছে?

ইউভাল নোয়া হারারির সতর্কবার্তা – বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদ ইউভাল নোয়া হারারি দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। তাঁর আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল মানুষের ব্যবহৃত আরেকটি যন্ত্র নয়। এটি এমন প্রযুক্তি, যা ক্রমবর্ধমানভাবে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে, নতুন ধারণা তৈরি করতে এবং মানুষের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে।

হারারির মতে, অতীতের প্রযুক্তির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মানুষ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে, কিন্তু সেই অস্ত্র নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না যে কখন এবং কোথায় বিস্ফোরিত হবে। বিপরীতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মানুষের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছাড়াই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। ২০২৬ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তৃতায় হারারি আইন, অর্থনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।

তাঁর সতর্কতার মূল বিষয় হলো, মানুষের সভ্যতা যে তথ্য, নিয়ম, ভাষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেগুলো পরিচালনায় মানুষের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হারারি পিএইচপির সাম্প্রতিক নিরাপত্তাত্রুটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গোপন ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেননি। কিন্তু তাঁর বৃহত্তর সতর্কবার্তা বর্তমান আলোচনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। কারণ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়—মানুষ কি নিজের তৈরি বুদ্ধিমান প্রযুক্তির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে?

সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো প্রযুক্তির বিদ্রোহ নয়, মানুষের অন্ধ বিশ্বাস –

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে প্রায়ই দেখানো হয়, একদিন রোবট মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। বাস্তব বিপদ হয়তো এতটা নাটকীয় হবে না। সম্ভবত কোনো যুদ্ধ হবে না। কোনো রোবট অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামবে না। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে না যে সে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। বরং বিপদ দেখা দিতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।

মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দিতে পারে। প্রথমে সফটওয়্যার তৈরির দায়িত্ব, তারপর নিরাপত্তা যাচাই, এরপর আর্থিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা এবং শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো পরিচালনার দায়িত্ব। প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকবে একটি যুক্তি—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তুলনায় দ্রুত, দক্ষ এবং কম ব্যয়বহুল। কিন্তু একসময় যদি দেখা যায়, মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করছে অথচ সেই সিদ্ধান্তের পেছনের সম্পূর্ণ যুক্তি বুঝতে পারছে না, তাহলে সেটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি একটি গভীর শাসনসংক্রান্ত সংকটও সৃষ্টি করবে।

তাহলে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রস্তাবিত নিরাপত্তা আপডেট বন্ধ করা উচিত? পিএইচপির সাম্প্রতিক ঘটনাই দেখিয়েছে, প্রকৃত নিরাপত্তাত্রুটি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে আক্রমণকারী কোনো কোনো পরিস্থিতিতে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিতে বা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তাই যাচাইকৃত নিরাপত্তা আপডেট গ্রহণ না করা বরং আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়তায় তৈরি নিরাপত্তা সংশোধনের ওপর কার্যকর মানবিক তদারকি নিশ্চিত করা।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কোড পর্যালোচনা, নিরাপত্তা পরীক্ষা, পরিবর্তনের স্বচ্ছ নথি সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে পূর্ববর্তী নিরাপদ সংস্করণে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করলেই তার প্রস্তাবিত প্রতিটি সংশোধন প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ করতে হবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক। একইভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ত্রুটি শনাক্ত করেছে বলেই সেই ত্রুটি মিথ্যা—এমন ধারণাও অযৌক্তিক। সঠিক অবস্থান হলো যাচাইযোগ্য প্রমাণ, স্বাধীন পরীক্ষা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – পিএইচপির সাম্প্রতিক ঘটনা প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একদিকে এটি প্রমাণ করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রযুক্তিগত সমস্যা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে এটি আমাদের সামনে নতুন একটি বাস্তবতা তুলে ধরছে—বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারের নিরাপত্তা রক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এর ভূমিকা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তৈরি সফটওয়্যারের ত্রুটি শনাক্ত করছে। আগামীকাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তৈরি অধিকাংশ সফটওয়্যার লিখবে। তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই সেই সফটওয়্যার পরীক্ষা করবে, সংশোধন করবে এবং নতুন সংস্করণ তৈরি করবে।

সেই ভবিষ্যতে মানুষের ভূমিকা কী হবে? মানুষ কি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ থাকবে, নাকি কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারী একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে কি না, শুধু সেটি নয়। বরং মানুষ তার নিজের তৈরি প্রযুক্তিকে স্বাধীনভাবে যাচাই, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে বন্ধ করার সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে কি না। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। মানুষকে প্রযুক্তির অধীনস্থ করে তোলা নয়।

পিএইচপির সাম্প্রতিক নিরাপত্তাত্রুটির ঘটনাকে তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো প্রমাণিত ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু এই ঘটনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের বলছে, মানুষের তৈরি সফটওয়্যারে ত্রুটি রয়েছে এবং সেই ত্রুটি সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু আগামীকাল যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই এমন কোনো পরিবর্তন প্রস্তাব করে, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়, তখন সেই পরিবর্তনের প্রকৃত উদ্দেশ্য যাচাই করবে কে? মানুষ কি তখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-কে নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা ও স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এখন থেকেই প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত সংকট হয়তো কোনো সফটওয়্যারের ত্রুটি থেকে সৃষ্টি হবে না। বরং সৃষ্টি হতে পারে সেই দিন, যেদিন মানুষ নিজের তৈরি প্রযুক্তির সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।

 

লেখক: নাশীত রহমান, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

লেখক পরিচিতি – নাশীত রহমান যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন বিশিষ্ট ও অভিজ্ঞ আইনজীবী, যিনি ইমিগ্রেশন, অ্যাসাইলাম ও মানবাধিকার আইনে বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবেও তাঁর রয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য পেশাগত অভিজ্ঞতা। তিনি জনপ্রিয় সরাসরি সম্প্রচারিত আইনি অনুষ্ঠান “Law with N Rahman”-এর দীর্ঘদিনের উপস্থাপক। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় ও নীতিনির্ধারণী আলোচনা, অভিবাসন আইন, মানবাধিকার এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখালেখি, আইনি বিশ্লেষণ, পরামর্শ ও অবদান ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

@ nash.uk@gmail.com

 

আরো পড়ুন

সুয়েলা ব্রেভারম্যান নিজের অতীতকে অস্বীকার করে দাবি করছেন — বহুসংস্কৃতিবাদই ব্রিটিশ সমাজকে ভেঙে দিয়েছে

রেন্ট গ্যারান্টি ইনস্যুরেন্স

বাজেট ২০২৩: বাড়িওয়ালাদের জন্য কী ঘোষণা করা হয়েছিল?