ভারতে বাংলাভাষী মুসলিম, রোহিঙ্গা, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, পরিচয় যাচাই এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি।
২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় কমিটি জাতিগত ও পরিচয়ভিত্তিক পুলিশি তল্লাশি এবং পরিচয় যাচাইয়ের কারণে বাংলাভাষী মুসলিম ও অভিবাসীদের অন্যায়ভাবে আটক করার অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে। কমিটির পর্যবেক্ষণে এসব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বৈষম্যের ঝুঁকি রয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের এই কমিটি অভিযোগ করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ফলে নির্দিষ্ট কিছু জাতিগত ও সামাজিক গোষ্ঠী অতিরিক্ত নজরদারি ও হয়রানির শিকার হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিম ও অভিবাসীদের পরিচয় যাচাইয়ের নামে আটক করার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে কমিটি।
পর্যালোচনায় বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি।
কমিটি বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তার যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের জন্য কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু বাংলাভাষী মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের বিষয় নয়, দলিত, আদিবাসী এবং বিভিন্ন তফসিলি সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে কমিটি। এসব জনগোষ্ঠী যেন জাতিগত, বর্ণগত বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে ভারত সরকার ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে। ভারতীয় প্রতিনিধিদল এসব অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ভারতের সংবিধান সব নাগরিকের সমতা, মর্যাদা ও বহুত্ববাদ নিশ্চিত করে এবং দেশের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে।
ফলে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং ভারতের সরকারি অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। একদিকে জাতিসংঘের কমিটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পুলিশি তল্লাশি, পরিচয় যাচাই, আটক, নির্যাতন ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে; অন্যদিকে ভারত এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সংবিধান ও বহুত্ববাদী কাঠামোর ওপর নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিম, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো যথাযথ তদন্ত ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা না হলে বিষয়টি ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটির এই পর্যবেক্ষণের পর এখন অভিযোগগুলোর তদন্ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ভারত কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
সূত্রঃ সিইআরডি\এএফপি
এম.কে

