TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যের নতুন অভিবাসন বিলে তীব্র বিতর্কঃ আশ্রয়ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

যুক্তরাজ্য সরকারের প্রস্তাবিত নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় বিলকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারের দাবি, বিলটি কার্যকর হলে একটি “কঠোর কিন্তু ন্যায্য” অভিবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে আইন, মানবাধিকার ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো আশ্রয়ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান না করে বরং নতুন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

প্রস্তাবিত বিলে আশ্রয় আপিল ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় একটি নতুন স্বাধীন অভিবাসন আপিল কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে, যেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ নাগরিকদের আপিল বিচারকার্যে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের মামলার জট দ্রুত কমানো সম্ভব হবে।

তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, অস্ট্রেলিয়ায় একই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করার পর আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব বেড়েছিল এবং মামলার জট আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। অভিবাসন খাতে আইনি সহায়তার সংকটের কারণে অনেক আবেদনকারী আইনজীবী ছাড়াই আপিল করতে বাধ্য হতে পারেন বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আপিল কাঠামো তৈরির পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান উন্নত করা বেশি কার্যকর হতো। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই বিপুলসংখ্যক আবেদন পরে আপিলে গড়ায়।

বিলে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অধিকারসংক্রান্ত অষ্টম অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেল এইটের ব্যাখ্যাও আরও সীমিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে পারিবারিক সম্পর্কের সংজ্ঞা সংকুচিত করা, আর্থিক স্বনির্ভরতার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া এবং বৈধ অনুমতি ছাড়া যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে গড়ে ওঠা পারিবারিক সম্পর্ককে কম গুরুত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে বিদেশি অপরাধীরা দূরবর্তী পারিবারিক সম্পর্কের অজুহাত দেখিয়ে বহিষ্কার এড়াতে পারবেন না। তবে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান আইনেই জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নতুন বিধান বাস্তবে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সরকারের প্রভাব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থার ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার ৬০০ জনকে যুক্তরাজ্য থেকে অপসারণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বহিষ্কার কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় বাধা মানবাধিকার আইন নয়; বরং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি, ভ্রমণ নথির অভাব এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত জটিলতা।

বিলে বর্তমান পাঁচ বছরের শরণার্থী সুরক্ষা মর্যাদার পরিবর্তে ৩০ মাসের অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এতে শরণার্থীদের কর্মসংস্থান, স্থায়ী বাসস্থান নিশ্চিত করা এবং সমাজে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে বিদ্যমান আবেদন নিষ্পত্তিতেই হিমশিম খাচ্ছে; ফলে এত ঘন ঘন মর্যাদা পুনর্মূল্যায়ন বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

বিলে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় শরণার্থীদের পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো হবে এবং আগামী বছর একটি নতুন শরণার্থী কর্মপথ চালু করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, কেবল কমিউনিটি পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করলে সরকারের দায়িত্ব আংশিকভাবে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো, সরকারি আবাসন ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া শরণার্থীদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে সেই ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত নেওয়ার সুযোগ রাখা। যদিও বিলে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই, বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন শরণার্থীকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পরিশোধ করতে হতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অনেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

এছাড়া আধুনিক দাসত্ব ও মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা সম্পর্কিত আইনেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, দেরিতে মানবপাচারের শিকার হওয়ার দাবি করলে সুরক্ষার সুযোগ সীমিত করা হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুতর মানসিক আঘাতের কারণে অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করতে পারেন না। ফলে এ ধরনের বিধান প্রকৃত ভুক্তভোগীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সামগ্রিকভাবে সরকারের দাবি, নতুন বিলের মাধ্যমে অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থা আরও কার্যকর, দ্রুত ও কঠোর হবে। তবে মানবাধিকার সংগঠন, শরণার্থী বিশেষজ্ঞ এবং আইনবিদদের একটি বড় অংশের মত হলো, প্রশাসনিক সংস্কার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান উন্নয়নের পরিবর্তে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করলে আশ্রয়ব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না; বরং অনেক আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীর অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

সূত্রঃ দ্য কনভারসেশন

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে টোরিদের ভাঙন থামছেই না, রিফর্মে যোগ দিলেন সাবেক মন্ত্রী মারিয়া কউলফিল্ড

যুক্তরাজ্যে রেন্টার্স রাইটস অ্যাক্টঃ জমিদারদের জন্য কঠোর নিয়ম, ভাড়াটেদের জন্য নিরাপত্তা

যুক্তরাজ্যে দাঙ্গায় লন্ডন মেয়র সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন