ইউরোপের বাজারে চীন থেকে আসা কম দামের পণ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য আনতে নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করা প্রতিটি পার্সেলের ওপর ২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি আরোপ করা হচ্ছে। অনলাইন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ছোট পার্সেল আমদানি হওয়ায় শুল্ক ও পণ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতেই এই ফি চালু করা হচ্ছে।
চীনের টেমু, শেইন ও আলিএক্সপ্রেসের মতো অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্ম থেকে ইউরোপে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কম দামের পণ্য পৌঁছাচ্ছে। এতে ইউরোপের স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চাপের মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের নিরাপত্তা, মান এবং শুল্কসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো সব পণ্যের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইইউতে প্রবেশ করা পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক যথাযথভাবে আদায় করা এবং পণ্য পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যয় মেটানোও এই পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য। ই-কমার্সের দ্রুত বিস্তারের ফলে শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাজের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন ২ ইউরো ফি পণ্য বিক্রির অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বিক্রেতা অথবা পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে হবে। ইইউর ২৭টি সদস্যদেশ এই অর্থ সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত অর্থের ৭৫ শতাংশ জমা হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটে এবং বাকি ২৫ শতাংশ সংশ্লিষ্ট সদস্যদেশগুলো পাবে।
এর আগে গত জুলাইয়ে ১৫০ ইউরোর কম মূল্যের ছোট পার্সেলের ওপর ৩ ইউরো শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই শুল্ক কার্যকরের পর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে ইইউতে প্রবেশ করা ছোট পার্সেলের সংখ্যা ৬০ শতাংশ কমেছে। তবে এত কিছুর পরও প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ পার্সেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশ করছে।
২০২৪ সালে ইইউতে আসা এসব ছোট পার্সেলের ৯১ শতাংশই ছিল চীন থেকে পাঠানো। বিপুলসংখ্যক কম দামের পণ্যের এই প্রবাহ ইউরোপের স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় ধরনের প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নতুন হ্যান্ডলিং ফি সেই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনার ব্যয় সামলাতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে ইইউ।
পণ্যের নিরাপত্তা ও মান নিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য ঠেকাতে গত সেপ্টেম্বরে নতুন আইনের প্রস্তাব দেয় ইউরোপীয় কমিশন। প্রস্তাবে ইইউভিত্তিক কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে পণ্যের নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনায় আইনগতভাবে দায়ী করার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।
এর আগে গত মে মাসে বিপজ্জনক শিশুখেলনা ও ত্রুটিপূর্ণ চার্জার বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাগত ঘাটতির অভিযোগে চীনা অনলাইন বিপণন প্রতিষ্ঠান টেমুকে ২০ কোটি ইউরো জরিমানা করে ইউরোপীয় কমিশন। এ ছাড়া অবৈধ পণ্য বিক্রির অভিযোগে শেইনের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। অভিযোগের তালিকায় শিশুসদৃশ যৌন পুতুল বিক্রির বিষয়টিও রয়েছে।
সব মিলিয়ে নতুন ২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি এবং আগের শুল্কব্যবস্থার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনলাইন আমদানি নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তবে নতুন ফি শেষ পর্যন্ত ইউরোপের ভোক্তাদের পণ্যমূল্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে বিক্রেতা ও পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে সামাল দেয় তার ওপর।
সূত্রঃ রয়টার্স
এমকে

