TV3 BANGLA
মুক্তমত

বাংলা সাহিত্য ও উপমা: কল্পনার রূপকার, ভাষার প্রাণস্পন্দন

নাশীত রহমান || লন্ডন || ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

বাংলা গান, নাটক, সাহিত্য ও কবিতায় উপমা যে কতটা অপরিহার্য—তা শুধু ভাষার অলংকারগত সৌন্দর্যের কারণে নয়, বরং বাংলা সৃষ্টিশীলতার গভীর কাঠামোর মধ্যেই উপমা এক মৌলিক শক্তি হিসেবে কাজ করে। উপমা বাংলা ভাষাকে দৃশ্যমান করে, অনুভূতিকে স্পর্শযোগ্য করে, আর বিমূর্ত ভাবনাকে রূপ দেয়। বাংলা সাহিত্যিক ঐতিহ্য এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে উপমা ছাড়া কোনো আবেগ, কোনো দৃশ্য, কোনো চরিত্র বা কোনো পরিবেশ সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না।
বাংলা গান উপমার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রেমের গান, ভক্তিগীতি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত—সব ক্ষেত্রেই উপমা আবেগকে রঙিন করে তোলে। চাঁদের মতো মুখ, তারার মতো চোখ, নদীর মতো স্নেহ, আগুনের মতো রাগ—এসব উপমা বাংলা গানের ভাষাকে সুরের মতোই জীবন্ত করে।
বাংলা নাটকে উপমা চরিত্রের আবেগকে দৃশ্যমান করে। নাটকের সংলাপ শুধু কথার বিনিময় নয়; সেখানে উপমা চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করে। রাগকে আগুনের সঙ্গে, দুঃখকে কাঁটার সঙ্গে, ভালোবাসাকে ফুলের সঙ্গে তুলনা—এসব উপমা নাটকের ভাষাকে নাটকীয় করে তোলে।
বাংলা সাহিত্যে উপমা হলো চিত্রকল্পের প্রধান ভিত্তি। উপন্যাসে পথ সাপের মতো এঁকেবেঁকে যায়, আকাশ মখমলের মতো কালো হয়, বেদনা কাঁটার মতো বিঁধে থাকে—এসব উপমা পাঠকের মনে দৃশ্য তৈরি করে। বাংলা গল্প ও উপন্যাসে উপমা চরিত্রকে জীবন্ত করে, পরিবেশকে বাস্তব করে, অনুভূতিকে গভীর করে।
বাংলা কবিতা উপমার রাজ্য। কবিতা হলো চিত্রকল্পের ভাষা, আর চিত্রকল্পের প্রাণ হলো উপমা। কবিরা ফুল, চাঁদ, নদী, মেঘ, আগুন, বৃষ্টি, রামধনু—এসবকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করে আবেগকে রূপ দেন। বাংলা কবিতার সৌন্দর্য, সুর, ছন্দ, আবেগ—সবই উপমার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।
বাংলা সৃষ্টিশীল রচনার সৌন্দর্য ও শক্তি অনেকটাই উপমার ওপর নির্ভরশীল। উপমা বাংলা ভাষাকে শুধু অলংকৃত করে না; এটি ভাষাকে প্রাণ দেয়, অনুভূতিকে দৃশ্যমান করে, পাঠক শ্রোতার মনে এক নতুন জগৎ তৈরি করে। তাই গান, নাটক, সাহিত্য, কবিতা—সব ক্ষেত্রেই উপমা একটি অপরিহার্য অলংকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলা সৃষ্টিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে উপমার এক অনন্য ও অতুলনীয় শিল্পী। তাঁর কবিতা, গান, গদ্য—সব ক্ষেত্রেই উপমা এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে তা বাংলা ভাষার প্রকাশশক্তিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। নজরুল উপমা নির্মাণে শুধু বাংলা শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করেননি; তিনি আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দকে উপমার ভেতরে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে বাংলা ভাষা পেয়েছে এক নতুন রূপ, নতুন ছন্দ, নতুন সৌন্দর্য। তাঁর উপমা কখনো আগুনের মতো তীব্র, কখনো ফুলের মতো কোমল, কখনো যুদ্ধের মতো শক্তিশালী, আবার কখনো প্রেমের মতো মধুর।
নজরুলের উপমার বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি শব্দকে শুধু তুলনা হিসেবে ব্যবহার করেন না; শব্দকে তিনি আবেগের রূপান্তর ঘটানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। আরবি ফারসি উর্দু শব্দ তাঁর হাতে হয়ে ওঠে চিত্রকল্পের রঙ, সুরের ধ্বনি, প্রেমের ভাষা। তাঁর কবিতায় দেখা যায়—সিম্বল, রূপক, উপমা সব মিলিয়ে এক বিস্ফোরক শক্তি, যা বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে দেয়।
বাংলা ও বাংলাদেশি সাহিত্য ইতিহাসে নজরুলের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি একজন সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথিকৃৎ। তাঁর লেখায় বিদ্রোহ আছে, প্রেম আছে, মানবতা আছে, সাম্য আছে। তিনি বাংলা ভাষাকে দিয়েছেন নতুন শব্দ, নতুন ছন্দ, নতুন সুর। তাঁর কবিতা ও গান আজও বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে, বাংলা সংস্কৃতিকে শক্তি দেয়, বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে।নজরুলের মোট গানসংখ্যা প্রায় ২,২৬০টি ।
বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশি সাহিত্যধারায় নজরুলের অবস্থান তাই একেবারে শীর্ষে। তিনি বাংলা ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন, এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা জাতিসত্তার গঠনে গভীর ভূমিকা রেখেছে।
“মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী” নজরুলের কল্পনা, রূপক, উপমা ও সুরের এক অপূর্ব সমন্বয়। গানটির পটভূমি একটি আড্ডার কল্পনাময় আলোচনার সঙ্গে যুক্ত, প্রথম প্রচার হয় ১৯৪০ সালে, এবং পরবর্তীতে এটি নজরুলগীতির অন্যতম জনপ্রিয় প্রেমের গান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। “মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী” কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত নজরুলগীতি।
এই গানটির রচনার সঙ্গে একটি প্রচলিত গল্প যুক্ত আছে। এক আড্ডায় কেউ প্রশ্ন করেছিলেন— “যদি প্রেয়সীকে নিজের মনের মতো সাজাতে পারি, তাহলে কীভাবে সাজাব?” আড্ডায় উপস্থিত সবাই কল্পনার সৌন্দর্য দিয়ে তাদের প্রিয়াকে সাজানোর কথা বলতে থাকেন। সেই আসরে নজরুলও ছিলেন। তিনি নিজের কল্পনার রূপকথাময় সৌন্দর্য দিয়ে প্রিয়াকে সাজানোর ভাবনা প্রকাশ করেন—আর সেই কল্পনা থেকেই জন্ম নেয় গানটি। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নজরুল বাস্তবের গোলাপ পদ্ম হীরা নয়; বরং তারার ফুল, চৈত্রের চাঁদ, হংস সারি, মেঘের রঙ, জোছনা, রামধনুর লাল রঙ—এমন সব ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা সৌন্দর্য দিয়ে প্রিয়াকে সাজিয়েছেন।
“মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী” গানটির রচনাকাল ও প্রথম প্রচার – গানটির রচনাকাল সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।১৪ ডিসেম্বর ১৯৪০, কলকাতা বেতারকেন্দ্রের “গুলবাগিচা” নামক গীতি-বিচিত্রায় গানটি প্রথম প্রচারিত হয়। তখন নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বছর ৬ মাস। গানটি পরবর্তীতে “গুলবাগিচা” গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। ডিসেম্বর ১৯৪২ এ HMV কোম্পানি গানটির রেকর্ড প্রকাশ করে (রেকর্ড নম্বর: N 27347)। শিল্পী: সত্য চৌধুরী, সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম, স্বরলিপি: নীলিমা দাস। গানটি রচনার সময় নজরুল ছিলেন পরিণত বয়সে, এবং তাঁর সঙ্গীতসৃষ্টি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

 

মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল।।
কণ্ঠে তোমার পরাবো বালিকা
হংস –সারির দুলানো মালিকা
বিজলী জরীণ ফিতায় বাঁধিব মেঘ রঙ এলো চুল।।
জোছনার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাব তোমার গায়
রামধনু হতে লাল রঙ ছানি’ আলতা পরাবো পায়।
আমার গানের সাত সুর দিয়া
তোমার বাসর রচিব প্রিয়া।
তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুলবুল।

 

১. খোঁপায় তারার ফুল প্রিয়ার খোঁপায় যে ফুল পরানো হবে, তাকে “তারার মতো” বলা হয়েছে। উপমা: ফুলের সৌন্দর্যকে রাতের আকাশের তারার সঙ্গে তুলনা। অর্থ: প্রিয়ার রূপ হবে আকাশের তারার মতো উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়।

২. কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল কানের দুলকে “চৈত্র মাসের তৃতীয়া তিথির চাঁদের মতো” বলা হয়েছে। উপমা: দুলের আকৃতি ও উজ্জ্বলতা চাঁদের মতো। অর্থ: প্রিয়ার কানে চাঁদের মতো কোমল, শুভ্র, শান্ত সৌন্দর্য ঝুলবে।

৩. কণ্ঠে পরাবো বালিকা হংস–সারির দুলানো মালিকা মালিকাকে “হংস সারির মতো দুলানো” বলা হয়েছে। উপমা: মালার দুলুনি হংসের সারিবদ্ধ চলার মতো। অর্থ: মালার নড়াচড়া হবে সুশৃঙ্খল, মসৃণ, মনোহর।

৪. বিজলী জরীণ ফিতায় বাঁধিব মেঘ রঙ এলো চুল চুলকে “মেঘের রঙের মতো” বলা হয়েছে। উপমা: চুলের রঙ মেঘের মতো কালো বা ধূসর। অর্থ: প্রিয়ার চুল প্রকৃতির মেঘের মতো কোমল, ঘন, আকর্ষণীয়।

৫. জোছনার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাব তোমার গায় চন্দন মাখানোর দৃশ্যকে “জোছনার মতো” বলা হয়েছে। উপমা: চন্দনের শুভ্রতা ও কোমলতা জোছনার মতো। অর্থ: প্রিয়ার গায়ে চন্দন লাগলে তা হবে চাঁদের আলোয় স্নিগ্ধ, শান্ত, পবিত্র।

৬. রামধনু হতে লাল রঙ ছানি’ আলতা পরাবো পায় আলতার লাল রঙকে “রামধনুর লাল রঙের মতো” বলা হয়েছে। উপমা: আলতার রঙ রামধনুর উজ্জ্বল লালের মতো। অর্থ: প্রিয়ার পা হবে রামধনুর মতো রঙিন, দীপ্তিময়।

৭. আমার গানের সাত সুর দিয়া তোমার বাসর রচিব প্রিয়া বাসরঘরকে “গানের সাত সুরের মতো” সাজানোর কথা বলা হয়েছে। উপমা: বাসরঘরের সাজ হবে সুরের মতো মধুর, সুরেলা, সুষম। অর্থ: প্রেমের বাসর হবে সংগীতের মতো সুন্দর ও আবেগময়।

৮. তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুলবুল প্রিয়াকে ঘিরে কবিতার বুলবুল গাইবে—এটি একটি কাব্যিক উপমা। উপমা: কবিতার সুরকে বুলবুল পাখির গানের সঙ্গে তুলনা। অর্থ: প্রেমের আবেগ হবে বুলবুলের গানের মতো মধুর, সুরেলা, কোমল।

এসবের সঙ্গে প্রিয়ার রূপ, সাজ, সৌন্দর্য ও আবেগকে তুলনা করে এক অপূর্ব চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছে। উপমার কারণে কবিতাটি হয়ে উঠেছে আরও রূপকথাময়, আরও দৃশ্যমান, আরও সুরেলা।
উপমার শক্তি বাংলা ভাষাকে যে কতটা গভীর, প্রাণবন্ত ও শিল্পিত করে তোলে—তার সারমর্ম হলো এই সত্য যে বাংলা সৃষ্টিশীলতার হৃদয়েই উপমা এক অনিবার্য সৌন্দর্য হিসেবে বাস করে। গান, নাটক, সাহিত্য ও কবিতায় উপমা শুধু অলংকার নয়; এটি অনুভূতির রূপকার, কল্পনার সেতুবন্ধন, ভাষার প্রাণস্পন্দন। উপমা বাংলা ভাষাকে দৃশ্যমান করে, শব্দকে রঙ দেয়, আবেগকে স্পর্শযোগ্য করে তোলে। তাই বাংলা সৃষ্টিশীল রচনার প্রতিটি স্তর—সুর, ছন্দ, সংলাপ, বর্ণনা, চিত্রকল্প—উপমার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। বাংলা সাহিত্যিক ঐতিহ্য উপমাকে শুধু গ্রহণ করেনি, তাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এই কারণেই বাংলা গান, নাটক, সাহিত্য ও কবিতা উপমা ছাড়া কল্পনাই করা যায় না; উপমাই বাংলা ভাষার সৌন্দর্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দীপ্তি।

আরো পড়ুন

বিশ্বকাপের রঙে রঙিন বাংলাদেশ, অথচ নিজের ফুটবল অন্ধকারে

নেতারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে সাজা দেন শহরবাসী

রাইট টু রেন্ট

অনলাইন ডেস্ক