ইংলিশ চ্যানেলে একটি ব্রিটিশ পতাকাবাহী ইয়টের উদ্দেশে রুশ যুদ্ধজাহাজের সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ঘটনাটিকে ব্রিটেনের জন্য “চরম অপমান” হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর দাবি তুলেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে আইল অব ওয়াইটের প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে রুশ নৌবাহিনীর গ্রিগোরোভিচ-শ্রেণির ফ্রিগেট অ্যাডমিরাল গ্রিগোরোভিচ-এর কাছাকাছি দিয়ে একটি ব্রিটিশ পতাকাবাহী ইয়ট অতিক্রম করছিল। এ সময় অজ্ঞাত কারণে ইয়টটির উদ্দেশে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও ঘটনাটি ব্রিটিশ আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে সংঘটিত হয়েছে, তবুও এটি যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক প্রভাব বলয়ের মধ্যেই ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শত্রুভাবাপন্ন বা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ যখন ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে, তখন সেগুলোকে অনুসরণ করা রয়্যাল নেভির নিয়মিত দায়িত্ব। তবে বর্তমানে সমুদ্রে মোতায়েনযোগ্য যুদ্ধজাহাজের সংকটের কারণে ব্রিটেনকে তুলনামূলক দুর্বল টহলজাহাজ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ঘটনার সময় রুশ ফ্রিগেটটিকে অনুসরণ করছিল এইচএমএস মার্সি, যা রিভার-শ্রেণির একটি টহলজাহাজ। জাহাজটিতে একটি ২০ মিলিমিটার কামান এবং দুটি মেশিনগান থাকলেও, আধুনিক নৌযুদ্ধের বাস্তবতায় এটি শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজের মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মত দিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, প্রায় ৪ হাজার টন ওজনের অ্যাডমিরাল গ্রিগোরোভিচ ফ্রিগেটটি কালিব্র ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, অনিক্স অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ১০০ মিলিমিটার নৌকামানসহ অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধরনের জাহাজের বিরুদ্ধে টহলজাহাজের কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।
এদিকে যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে রয়্যাল নেভির হাতে সাতটি ফ্রিগেট ও ছয়টি ডেস্ট্রয়ার থাকলেও, এর মধ্যে কয়েকটি জাহাজ সমুদ্রে মোতায়েনের উপযোগী নয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের কাছে কার্যকর অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ন্যাটোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসনের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো পুনর্গঠনের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বহু বছর ধরে ধারাবাহিক বাজেট সংকোচন, যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা হ্রাস এবং সামরিক সক্ষমতায় বিনিয়োগের ঘাটতির ফলে ব্রিটেনের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অবহেলার ফল।
এ বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি সত্য হলে তা ইংলিশ চ্যানেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ, আধুনিক যুদ্ধজাহাজ সংগ্রহ এবং নৌ ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাজ্যের সামরিক বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

