ব্রিটেনে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসীদের ছোট নৌকা ঠেকাতে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজের দলের জ্যেষ্ঠ নেতা রবার্ট জেনরিকের এমন প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন ডেইলি মিররের কলাম লেখক রস উইন-জোনস। তার মতে, যুদ্ধ, নিপীড়ন ও জীবন বাঁচানোর তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ব্রিটেনে আসা মানুষদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়েই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
ডেইলি মিররের এক নিবন্ধে রস উইন-জোনস সিরিয়ার একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ফ্রান্সের কালেতে লর্ড আলফ ডাবসের সঙ্গে এক সফরে উইসাম নামের এক অসুস্থ শিশুর পরিবারের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। শিশুটির বাবা-মা তাকে চিকিৎসার জন্য ব্রিটেনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথে ব্রিটেনে আসার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি বলে লেখায় উল্লেখ করেন তিনি।
পরিস্থিতির কারণে পরিবারটি শেষ পর্যন্ত ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই যাত্রার সঙ্গে শিশুটির মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল বলে লেখক দাবি করেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, সাত বছর বয়সী উইসামের বাবা-মাকে সন্তানের চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ার ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং সমুদ্রযাত্রার প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
রস উইন-জোনস প্রশ্ন তুলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে পড়া পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের প্রস্তাব কতটা মানবিক। তার বক্তব্য, সাধারণ মানুষকে এমন জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে হয় না, কিন্তু যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালানো পরিবারগুলোকে প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
নিবন্ধে আফগানিস্তানের করিম নামের এক তরুণের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের সঙ্গে পরিচয়ের সময় করিমের বয়স ছিল ২২ বছর। তার দাবি অনুযায়ী, তালেবানের হাতে নিপীড়নের আশঙ্কায় তার বাবা-মা তাকে নিরাপদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। করিম ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পাঁচবার চেষ্টা করেছিলেন।
করিমের বর্ণনা উদ্ধৃত করে লেখক জানান, একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করছিলেন। নৌকাটি থেকে কয়েকজন তরুণকে পানিতে পড়ে ডুবে যেতে দেখেছিলেন করিম। যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই একে অপরের নামও জানতেন না।
লেখক আরও উল্লেখ করেন, দারফুরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে আবদুল নামের এক ব্যক্তি তার পরিবার ও গ্রামের মানুষদের হারিয়েছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে তাকে নিরাপত্তার খোঁজে পালাতে হয়েছিল। পরে তার জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রস উইন-জোনসের সঙ্গে ‘দ্য জার্নি’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয় বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
রস উইন-জোনসের অভিযোগ, অভিবাসীদের মানুষ হিসেবে না দেখে তাদের অমানবিকভাবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক বক্তব্যকে আরও কঠোর করে তুলছে। তার মতে, যারা ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের সবাইকে একইভাবে বিবেচনা না করে প্রত্যেকের পেছনের পরিস্থিতি বোঝা প্রয়োজন।
তিনি আরও লিখেছেন, ব্রিটেনে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে ছোট নৌকায় আসা মানুষদের বিষয়টি বারবার রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রে চলে আসছে। তার আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য শেষ পর্যন্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও বিপজ্জনক পদক্ষেপের পথ তৈরি করতে পারে।
সূত্রঃ ডেইলি মিরর
এমকে

