আয়ারল্যান্ডে ভিসা নবায়ন ও মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় নিজ দেশ ভারতে ফিরে যেতে হচ্ছে ২৫ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণী জয়শ্রী মালিককে। ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে সেখানে কাজ করলেও ভিসা জটিলতার কারণে চাকরি হারান তিনি। শেষ পর্যন্ত নির্বাসনের সরকারি চিঠিকেই নিজের স্ট্যান্ড-আপ কমেডির অংশ বানিয়ে অভিবাসন ব্যবস্থার জটিলতা ও হতাশার কথা তুলে ধরছেন এই তরুণী।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়শ্রী মালিক ভারতের দিল্লির কাছের গুরগাঁও থেকে ২০২২ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় আয়ারল্যান্ডে যান। ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে সাহিত্যে এমফিল ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। পড়াশোনার সময় কলেজে শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়ার কাজও করতেন।
স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষে আয়ারল্যান্ডের তৃতীয় স্তরের স্নাতক কর্মসূচির আওতায় দুই বছর দেশটিতে থাকা ও কাজ করার অনুমতি পান জয়শ্রী। এরপরও ট্রিনিটি কলেজে আন্তর্জাতিক বিনিময় কর্মসূচির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ চালিয়ে যান তিনি।
পরবর্তী সময়ে নতুন ভিসার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকার অনুমতি বাড়ানোর জন্য দেশটির বিচার বিভাগে আবেদন করেন জয়শ্রী। কিন্তু আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চাকরি হারান তিনি। আবেদন বিবেচনাধীন থাকাকালে তার কাজ করার অধিকার নেই বলে জানানো হয়েছিল। ফলে সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে চলতে হয় তাকে।
চাকরির প্রস্তাব পেয়েও ভিসা জটিলতার কারণে তা গ্রহণ করতে পারেননি জয়শ্রী। দেশটির সরকারি গণপূর্ত বিভাগ থেকেও কাজের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভিসার সমস্যার কারণে সেই চাকরিতে যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
জয়শ্রী বলেন, “সরকারের কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব পাচ্ছি, অথচ সরকারেরই তৈরি করা ভিসা জটিলতার কারণে সেই চাকরি নিতে পারছি না। বিষয়টি পুরোপুরি অযৌক্তিক।”
ভিসা নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে মানসিক চাপ সামলাতে ডাবলিনের বিভিন্ন ওপেন-মাইক কমেডি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে নিজের অভিজ্ঞতাকেই হাস্যরসের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। তার পরিবেশনার একটি পর্যায়ে আয়ারল্যান্ড সরকারের পাঠানো নির্বাসনের চিঠি দর্শকদের সামনে পড়ে শোনান।
চিঠিতে বলা হয়েছিল, ১৯৯৯ সালের অভিবাসন আইনের তৃতীয় ধারার আওতায় তার বিরুদ্ধে নির্বাসনের আদেশ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া দেশটিতে অবস্থান করায় তাকে ফেরত পাঠানো জনস্বার্থের অনুকূল হবে বলে মন্ত্রীর মতামতের কথাও উল্লেখ ছিল।
প্রথমে দর্শকেরা বিষয়টিকে কমেডির অংশ ভেবেছিলেন। পরে বুঝতে পারেন, চিঠিটি বাস্তব এবং জয়শ্রী সত্যিই আয়ারল্যান্ড ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ। তবে মঞ্চে উঠে দর্শকদের হাসাতে পারলে তার ক্ষোভ ও হতাশা কিছুটা সামাল দিতে পারেন।
গত ৫ অক্টোবর তাকে নির্বাসনসংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে জোর করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না; তিনি স্বেচ্ছায় আয়ারল্যান্ড ছাড়ছেন। আগামী মাসে ভারতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জয়শ্রী। ১৪ নভেম্বর ভোরে ডাবলিন বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
আয়ারল্যান্ডে অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে জয়শ্রীর ঘটনা সামনে এসেছে। দেশটিতে আবাসনসংকট ও সরকারি পরিষেবার ওপর চাপের প্রেক্ষাপটে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়প্রক্রিয়া এবং নাগরিকত্বের নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। সরকারের দাবি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, কঠোর নীতির কারণে যোগ্য আবেদনকারীরাও অন্যায্য পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন।
আয়ারল্যান্ডের লেবার পার্টির নেতা ও আইনপ্রণেতা ইভানা বেসিক বলেছেন, জয়শ্রীর ঘটনা অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ার প্রভাব তুলে ধরে। তার মতে, এর ফলে শুধু অভিবাসীরাই নন, নিয়োগকর্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ তারা দক্ষ কর্মী হারাচ্ছেন।
গাজা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঘটনাও তুলে ধরেছেন বেসিক। তার অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে এমন নথি চাওয়া হয়েছে, যেগুলো আগে চাওয়া হয়নি। গাজার শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন জানিয়েছে, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী ও দেশে ফিরে যাওয়ার অভিপ্রায়ের প্রমাণের মতো নথি না দেওয়ার অভিযোগে কিছু আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অথচ গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ডাকযোগে মূল নথি পাঠানোও কঠিন।
আয়ারল্যান্ডের বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র বলেছেন, অভিবাসন ব্যবস্থায় যাচাই-বাছাই ও তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও দাবি করেছে বিভাগটি। প্রতিটি ভিসার আবেদন নিজস্ব যোগ্যতা ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয় বলে জানানো হয়েছে।
জয়শ্রী জানিয়েছেন, আয়ারল্যান্ডে তিনি অনেক বন্ধু পেয়েছেন, যাদের নিজের পরিবারের মতো মনে করেন। তার চলে যাওয়ার বিষয়টি তাদেরও ক্ষুব্ধ করেছে। তবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বাস্তবতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন না তিনি। তার ধারণা, বিমানে ওঠার পরই হয়তো বিষয়টি সত্যিকার অর্থে অনুভব করবেন।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

