যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকার অভিভাবকদের বড় একটি অংশ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া স্কুল ইউনিফর্মের নতুন নিয়ম সম্পর্কে এখনো জানেন না। প্রতি শিক্ষাবর্ষে ভুল পোশাক পরার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বাড়ি পাঠানোর ঘটনা নিয়ে আলোচনা হলেও, নতুন এই নিয়মের লক্ষ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে আর্থিকভাবে চাপে থাকা পরিবারগুলোর ওপর স্কুল ইউনিফর্মের খরচ কমানো।
সেপ্টেম্বর থেকে অধিকাংশ স্কুল একজন শিক্ষার্থীর জন্য সর্বোচ্চ তিনটি ব্র্যান্ডেড ইউনিফর্ম সামগ্রী কেনার বাধ্যবাধকতা দিতে পারবে। নতুন এই নিয়মের উদ্দেশ্য হলো পরিবারগুলোর স্কুল-সংক্রান্ত ব্যয় কমানো এবং বিশেষ করে ব্র্যান্ডেড পোশাকের অতিরিক্ত খরচ নিয়ন্ত্রণ করা।
পরামর্শ বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘মানি ওয়েলনেস’-এর জন্য স্কুলপড়ুয়া সন্তান রয়েছে এমন ১ হাজার অভিভাবকের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ অভিভাবক সম্পূর্ণভাবে জানতেন না যে নতুন নিয়ম চালু হতে যাচ্ছে।
সরকারের ‘শিশু কল্যাণ ও স্কুল আইন’-এর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ, পরিবারগুলোর ব্যয় কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা এবং প্রারম্ভিক শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার মান উন্নত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বর থেকে স্কুলগুলো আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে ব্র্যান্ডেড ইউনিফর্ম ও শরীরচর্চার পোশাকের বাধ্যতামূলক সামগ্রীর সংখ্যা তিনটি বা তার কম রাখতে। তবে মাধ্যমিক ও মধ্যবর্তী পর্যায়ের স্কুলে একটি টাই থাকলে সর্বোচ্চ চারটি ব্র্যান্ডেড সামগ্রী বাধ্যতামূলক করা যাবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রায় আরও ৫ লাখ শিশু বিনামূল্যের স্কুল খাবারের জন্য যোগ্য হবে। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২ হাজারের বেশি বিনামূল্যের সকালের নাশতা কেন্দ্র চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে অভিভাবকদের খরচ কমানোর পাশাপাশি শিশুদের স্কুলে যাওয়ার আগে পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
নতুন বিধিমালা একাডেমি স্কুল ও একাডেমি ট্রাস্ট, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিচালিত স্কুল এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পরিচালিত বেসরকারি নয় এমন বিশেষ স্কুলগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, স্কুল ইউনিফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুলের পরিচয় ও সম্প্রদায়ের অনুভূতি তৈরি হওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে ইউনিফর্ম অবশ্যই সাশ্রয়ী হতে হবে এবং এর খরচ কখনোই কোনো স্কুলে ভর্তি বা স্কুলের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের জন্য বাধা হওয়া উচিত নয়।
প্রতিটি স্কুলের ইউনিফর্ম নীতিমালা তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে এবং সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ সব অভিভাবকের জন্য তা সহজলভ্য রাখতে হবে। কোন পোশাক বাধ্যতামূলক এবং কোনগুলো ঐচ্ছিক—সেটিও নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
স্কুলগুলোকে সাধারণ পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর সঙ্গে একচেটিয়া চুক্তি এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অভিভাবকরা বিভিন্ন দোকান বা সরবরাহকারীর কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় পোশাক কেনার সুযোগ পাবেন।
শিক্ষার্থী স্কুলের ইউনিফর্ম নীতি মেনে না চললে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধান শিক্ষক নিতে পারবেন এবং তা স্কুলের প্রকাশিত আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তবে নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে নির্ধারিত ইউনিফর্ম কিনতে না পারলে তাকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, বিরতির সময় বা অতিরিক্ত শিক্ষামূলক কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
অভিভাবকদের সংগঠন ‘প্যারেন্টকাইন্ড’-এর প্রধান নির্বাহী ফ্র্যাঙ্ক ইয়ং বলেন, লাখ লাখ অভিভাবক স্কুল ইউনিফর্মের মতো অতিরিক্ত ও ব্যয়বহুল খরচ নিয়ে সংগ্রাম করছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে সবাই চাপের মধ্যে থাকলেও অভিভাবকদের এমন কিছু স্কুল-সংক্রান্ত ব্যয় রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, নতুন আইন এসব পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে, কারণ এর মাধ্যমে ব্যয়বহুল ইউনিফর্ম সামগ্রীর সংখ্যা সীমিত করা হচ্ছে। এর ফলে আর্থিকভাবে চাপে থাকা পরিবারগুলোর পাশাপাশি মধ্যম আয়ের অনেক পরিবারও উপকৃত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিনামূল্যের সকালের নাশতা কেন্দ্র এবং কম খরচের স্কুল ইউনিফর্ম অভিভাবকদের ওপর থাকা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। বেশি সংখ্যক সকালের নাশতা কেন্দ্র চালু হলে অভিভাবকদের কাজ ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে সন্তানদের সময়মতো স্কুলে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
শিশু কমিশনার ডেম র্যাচেল ডি সুজা বলেন, ‘শিশু কল্যাণ ও স্কুল আইন’ শিশুদের সামাজিক সেবা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত এবং শিশুকেন্দ্রিক পদ্ধতি গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি জানান, শিশুদের জন্য একক পরিচয় নম্বর এবং শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভাই-বোনদের একসঙ্গে রাখার মতো বেশ কিছু পদক্ষেপের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।
তবে ব্যাপক সংস্কারের পরও নতুন নিয়মগুলো বাস্তবে পরিবারের আর্থিক চাপ কতটা কমাতে পারবে, তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। জরিপে প্রায় ৬১ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, ব্র্যান্ডেড ইউনিফর্মের সংখ্যা সীমিত করলে তাদের খরচ কমবে। অন্যদিকে ৩০ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, এতে তাদের কোনো আর্থিক সুবিধা হবে না।
নতুন নিয়মের মূল লক্ষ্য হলো স্কুল ইউনিফর্মের খরচ কমিয়ে পরিবারগুলোর ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানো। তবে নিয়মটি সম্পর্কে প্রায় অর্ধেক অভিভাবক আগে থেকে অবগত না থাকায় সেপ্টেম্বর থেকে এটি কার্যকর হওয়ার পর স্কুল ও পরিবার—উভয়ের মধ্যেই নতুন নিয়ম নিয়ে আরও সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন হতে পারে।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এম.কে

