যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) প্রজাতির মশাকে প্রজনন করতে দেখা গেছে। ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস ছড়াতে সক্ষম এই আক্রমণাত্মক মশার পূর্ণবয়স্ক নমুনা ও লার্ভা পূর্ব লন্ডনের কয়েকটি আবাসিক এলাকায় শনাক্ত হওয়ার পর দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করেছে।
এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়। এটি ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং হলুদ জ্বরের মতো রোগের ভাইরাস বহন ও সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত এই মশার উপস্থিতি থেকে কোনো মানুষের সংক্রমিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
UK Health Security Agency (UKHSA) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাজ্যে এর আগে এই প্রজাতির মশা শনাক্ত হলেও এবারই প্রথম নিশ্চিতভাবে প্রমাণ পাওয়া গেল যে এটি দেশটির মাটিতে প্রজনন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে এডিস ইজিপ্টাই শনাক্ত হওয়ার এটি চতুর্থ ঘটনা।
মশাটির উপস্থিতি প্রথম শনাক্ত হয় UKHSA-এর Mosquito Watch নজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে। এরপর পূর্ব লন্ডনের সংশ্লিষ্ট এলাকায় মশা ধরার কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে এবং লার্ভা ধ্বংস করতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। UKHSA-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই মুহূর্তে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি খুবই কম। কারণ মশাটি কোনো রোগজীবাণু বহন করছে—এমন প্রমাণ নেই এবং এর কারণে স্থানীয়ভাবে মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু, জিকা বা অন্য কোনো সংক্রমণ ছড়ানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়নি।
UKHSA-এর মেডিক্যাল এনটোমোলজি ও জুনোসিস ইকোলজি বিভাগের প্রধান ড. জোলিয়ন মেডলক জানিয়েছেন, এডিস ইজিপ্টাই এমন দেশগুলোতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ছড়াতে পারে যেখানে এসব ভাইরাস আগে থেকেই সক্রিয়। কিন্তু পূর্ব লন্ডনে পাওয়া মশাগুলোর কারণে মানুষের সংক্রমণের কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত নেই।
তার মতে, এসব মশা সম্ভবত দুর্ঘটনাবশত যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছে। আক্রমণাত্মক মশা গাড়ি, লাগেজ কিংবা আমদানি করা গাছপালার সঙ্গে ‘হিচহাইক’ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছাতে পারে। কোনো এলাকায় আবহাওয়া অনুকূল হলে সেখানে কিছু সময়ের জন্য বেঁচে থাকা ও প্রজনন করাও সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বড় কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এডিস ইজিপ্টাই ঐতিহাসিকভাবে উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের মশা হলেও পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় মশাবাহিত রোগের বাহক প্রজাতিগুলোর বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের বর্তমান জলবায়ু এখনো এই মশার দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়, তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ পরিবেশবিদ্যার অধ্যাপক হিদার ফার্গুসন বলেছেন, ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে যুক্তরাজ্যে এসব রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশগত পরিস্থিতি যথেষ্ট অনুকূল নয়। তবে উষ্ণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি পরিবর্তিত হতে পারে। তার মতে, মশাটিকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনার ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. সিজার লোপেজ-কামাচোও সতর্ক করেছেন যে মশার উপস্থিতি এবং মশাবাহিত ভাইরাসের উপস্থিতি এক বিষয় নয়। কোনো রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার জন্য একই সঙ্গে সক্ষম মশা, উপযুক্ত পরিবেশ এবং সংক্রমিত ব্যক্তির মতো একাধিক বিষয় প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া এখনো এডিস ইজিপ্টাইয়ের দীর্ঘমেয়াদি বিস্তারের পথে বড় বাধা। সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের কারণে স্থানীয়ভাবে মশাটির প্রজননের সুযোগ তৈরি হলেও দেশটির সামগ্রিক জলবায়ু এখনো দীর্ঘমেয়াদে এর টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত ঠান্ডা। উত্তর ইউরোপে এ প্রজাতির স্থায়ীভাবে টিকে থাকার নজিরও এখনো নেই।
তবে UKHSA মনে করছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে এ ধরনের আক্রমণাত্মক মশার ঘটনা আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন মশা প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনাও বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে এসব মশা যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বাড়ির বাগান ও আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছে UKHSA। বালতি, ফুলের টব, বিভিন্ন পাত্র বা অন্য যেকোনো স্থানে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পানিও মশার প্রজননের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। তাই নিয়মিত এসব স্থান পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
এম.কে

