TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

সমান সুযোগ ছাড়া ভারতকে বিদ্যুৎ করিডর দেবে না বাংলাদেশঃ নেপাল হতে জলবিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা

বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাবে শর্তসাপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে ঢাকা। সমান সুযোগ ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিডের নিশ্চয়তা ছাড়া ভারতকে একক বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডর ব্যবহারের অনুমতি দিতে চায় না বাংলাদেশ। অন্যদিকে নেপাল থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সস্তা জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আঞ্চলিক গ্রিড নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

৯ ও ১০ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ সচিবদের ১৯তম আঞ্চলিক সম্মেলনে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন। সম্মেলনে ভারত বাংলাদেশের পার্বতীপুর দিয়ে ৭৬৫ কিলোভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের অনুমতি চায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য আঞ্চলিক গ্রিড নির্মাণের প্রস্তাব তুলে ধরে।

ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে চায়। প্রস্তাবিত এই লাইন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশও প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে।

তবে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, কেবল ভারতের বিদ্যুৎ পরিবহনের সুবিধার জন্য দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী একজন নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সমান সুযোগ ছাড়া বাংলাদেশ এই করিডরের অনুমতি দিতে রাজি নয়। বাংলাদেশ মনে করে, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সরাসরি বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভারত-ভুটান-বাংলাদেশ কিংবা নেপাল-ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে আঞ্চলিক গ্রিড নির্মাণ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত বিদ্যুৎ বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এতে বাংলাদেশ শুধু বিদ্যুৎ পরিবহনের মধ্যবর্তী দেশ হিসেবে থাকবে না, বরং সস্তা জলবিদ্যুৎ আমদানি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ রপ্তানির সুযোগও পাবে। বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্যান্য দেশও আঞ্চলিক গ্রিড নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছে বলে জানা গেছে। সম্মেলনের আলোচনার ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেবে। আগামী বছর বিদ্যুৎ সচিবদের পরবর্তী আঞ্চলিক বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নেপাল বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত জলবিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। এই বিপুল বিদ্যুৎ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক গ্রিড নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশ নেপাল থেকে দিনে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানি করছে। এই বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ৮ টাকা ১৭ পয়সা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে গড়ে ১৩ টাকার বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছে।

নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পাশাপাশি শীতকালে বাংলাদেশ থেকে নেপালে বিদ্যুৎ রপ্তানির সম্ভাবনাও রয়েছে। গ্রীষ্মে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও শীতকালে তা ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। ফলে শীতকালে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। দুই দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার এই পার্থক্য কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য নেপাল ও ভুটান থেকে তুলনামূলক কম দামে জলবিদ্যুৎ আমদানি করতে পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সঞ্চালন অবকাঠামো, বিদ্যুৎ বিনিময়ের নিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগে ১৯ ও ২০ জুলাই দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ভারতের করিডর প্রস্তাব নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। ওই নথিপত্রে ২০২৫ সালে লাইনের নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৮ সালে শেষ করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ ছিল। তবে তৎকালীন সরকার প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি।

৬ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তিনি ৭৬৫ কিলোভোল্টের গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে মন্ত্রী জানান, ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গ্রিড লাইন নিয়ে যেতে চাচ্ছে, বাংলাদেশ সেভাবে বিষয়টি বিবেচনা করছে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে উঠলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে বিদ্যুৎ বিনিময়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষ করে নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাংলাদেশের মৌসুমি বিদ্যুৎ চাহিদার মধ্যে সমন্বয় আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট, বিদ্যুৎ করিডর নিয়ে আলোচনা শুধু ভারতের প্রয়োজনের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সব দেশ সমানভাবে উপকৃত হবে এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানি ও রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।

সূত্রঃ প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো ভারত

এমকে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবঃ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

বদলে যাচ্ছে পুলিশের ইউনিফর্ম–লোগো

ডেঙ্গু টিকার সফল পরীক্ষা বাংলাদেশে