20.5 C
London
September 15, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

এসাইলাম শেল্টারে ব্রিটিশ পুরুষের যৌন নিপীড়নঃ ধর্ষণের শিকার নারী আশ্রয়প্রার্থী

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের কয়েকজন ব্রিটিশ পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও যৌন শোষণের অভিযোগ তুলেছেন। তবে আশ্রয়ের আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকেই অভিযোগের পরও ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ায় যেতে ভয় পেয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, আশ্রয়প্রার্থী নারীদের যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে পুরুষ আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে প্রচারণা জোরদার হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ডানপন্থী আন্দোলনকারী ড্যানিয়েল থমাস, যিনি ‘ড্যানি টমো’ নামে পরিচিত, ডোভার ও পোর্টসমাউথে আশ্রয়প্রার্থীদের আগমন নিয়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ধর্ষণের অভিযোগকে অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে আশ্রয়প্রার্থীদের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রকাশিত সরকারি তথ্য-উপাত্ত নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে এক নারী আশ্রয়প্রার্থীর অভিযোগ তুলে ধরা হয়, যিনি ধর্মীয় নিপীড়ন ও পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে এসে দুই বছর একটি আশ্রয় হোটেলে ছিলেন। তার অভিযোগ, ওই হোটেলের একজন কর্মী তাকে নিয়মিত মৌখিক ও শারীরিকভাবে হয়রানি করতেন।

ওই নারী জানান, নথিপত্র দেওয়ার সময় কর্মীটি তার অনুমতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করতেন এবং তার হাত ধরে রাখতেন। পরে তিনি নিয়মিত ওই নারীর কক্ষে যেতে শুরু করেন এবং তাকে পানীয় পান ও ডেটে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। একপর্যায়ে হোটেলের ডাটাবেস থেকে ওই নারীর ফোন নম্বর নিয়ে ব্যক্তিগত ফোনে বার্তা পাঠিয়ে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

পরে বিষয়টি হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানালে তাকে অন্য একটি হোটেলে স্থানান্তর করা হয়।

অন্য এক ইরানি নারী, যিনি যুক্তরাজ্যে আসার পর হিথ্রো বিমানবন্দরের কাছে হোম অফিসের ব্যবস্থাপনায় একটি হোটেলে ছিলেন, অভিযোগ করেন যে ওই হোটেলের একজন নিরাপত্তাকর্মী তাকে ধর্ষণ করেন।

তিনি জানান, হামলার পর হোটেল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলেও পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। ইরানের পুলিশের সঙ্গে তার পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাজ্যের পুলিশ কীভাবে বিষয়টি নেবে তা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন।

একই সঙ্গে তার আশঙ্কা ছিল, ধর্ষণের অভিযোগ করলে তার আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। অভিযোগ জানানোর পর তাকে অন্য একটি হোটেলে স্থানান্তর করা হয়। অভিযুক্ত নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধে পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

আরেক ঘটনায় উগান্ডার এক লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থী অভিযোগ করেন, তার অভিবাসন মামলায় আইনি সহায়তার বিনিময়ে একজন ব্যক্তিগত অভিবাসন আইনজীবী তাকে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য করেন। ওই নারী জানান, নিজের যৌন পরিচয়ের কারণে নিজ দেশে কারাবন্দি কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইনি সহায়তার জন্য তার কাছে অর্থ না থাকায় ওই আইনজীবী যৌন সম্পর্ককে পারিশ্রমিক হিসেবে দাবি করেন। ওই নারী জানান, পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার মতো কোনো উপায় তার ছিল না।

দ্য গার্ডিয়ান জানায়, তিন নারীই পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে শরণার্থী মর্যাদা লাভ করেন।

আশ্রয় আবাসনে যৌন নিপীড়নের ঘটনা বাস্তব সংখ্যার তুলনায় কম রিপোর্ট করা হয়ে থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে হোম অ্যাফেয়ার্স সিলেক্ট কমিটির এক তদন্তে আশ্রয় আবাসনে নিরাপত্তা ও সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

তদন্তে ব্রিটিশ রেড ক্রস আশ্রয় আবাসনে নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে শরণার্থী সহায়তা কার্যক্রমে থাকা কর্মীদের ওপর “অসাধারণ চাপ” তৈরি হওয়ার কথা জানায়। তাদের দেওয়া উদাহরণের মধ্যে ছিল—একটি হোটেলে গভীর রাতে একজন কর্মী গোসলরত এক নারীর কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন।

একটি আশ্রয় হোটেলে যৌন হয়রানির ব্যাপক পরিবেশ থাকার অভিযোগও তদন্তে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে যৌন নিপীড়নের ঘটনাও ছিল বলে ব্রিটিশ রেড ক্রস জানিয়েছে।

আশ্রয়প্রার্থী নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন উইমেন ফর রিফিউজি উইমেন বলেছে, নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়কে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

সংগঠনটির একজন মুখপাত্রের মতে, এ ধরনের প্রচারণা নির্যাতনের বাস্তবতাকে বিকৃত করে, ভুক্তভোগীদের সহায়তা ও বিচার পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করে এবং বর্ণবাদী ধারণার আড়ালে অপরাধীদের জবাবদিহির বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তার জন্য আসা মানুষদের বিরুদ্ধে নারী ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতার বিষয়কে ব্যবহার করা একটি বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। তাদের বক্তব্য, নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট জাতীয়তা বা অভিবাসন অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

রেপ ক্রাইসিস ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস-এর প্রধান নির্বাহী সিয়ারা বার্গম্যানও আশ্রয়প্রার্থী নারীদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যৌন সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণ থেকে আশ্রয়প্রার্থী নারীদের রক্ষায় যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় তার সংগঠন উদ্বিগ্ন।

তার মতে, আশ্রয়প্রার্থী নারী ও কিশোরীরা যৌন নির্যাতন ও শোষণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেরই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং অধিকার প্রয়োগের কার্যকর সুযোগও সীমিত।

বার্গম্যান বলেন, ব্রিটিশ সরকার এক দশকের মধ্যে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই উদ্যোগে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী ও আশ্রয় ব্যবস্থার মধ্যে বসবাসরত নারী ও কিশোরীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

এদিকে হোম অফিস জানিয়েছে, তাদের আবাসন ব্যবস্থায় এ ধরনের অভিযোগ মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আশ্রয় আবাসন ও সহায়তার স্টেটমেন্ট অব রিকোয়ারমেন্টস-এ অভিযোগের শিকার ব্যক্তি ও অন্যদের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় সহায়তা নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

৮ সপ্তাহের বেশি ইংল্যান্ডের বাইরে থাকলে বন্ধ হবে চাইল্ড বেনিফিট

যুক্তরাজ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব

অবৈধ পথে আসলেই আটক ও ফেরত পাঠানো হবেঃ কড়া হুঁশিয়ারি ব্রিটিশ সরকারের

নিউজ ডেস্ক