যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত চারটি বরো—টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, রেডব্রিজ ও বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামে রেকর্ডসংখ্যক ৮০ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্য ও পূর্ব লন্ডনের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থানের বড় প্রমাণ বলে অভিহিত করছেন।
এবারের নির্বাচনে লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে তিন শতাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রার্থী হন। ফলাফলে দেখা যায়, মূলধারার বড় দলগুলোর পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও আঞ্চলিক জোট থেকেও বাংলাদেশি প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন।
টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতিহাসঃ চার বরোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে টাওয়ার হ্যামলেটসে। ৪৫ সদস্যের কাউন্সিলে স্থানীয় এসপায়ার পার্টি ৩৩টি আসনে জয় পেয়ে রেকর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে—নির্বাচিত সব কাউন্সিলরই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। এছাড়া লেবার পার্টি থেকে তিনজন ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে একজন বাংলাদেশি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে টানা চতুর্থবারের মতো নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন লুৎফুর রহমান। তিনি প্রায় ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট পেয়ে লেবার প্রার্থী সিরাজুল ইসলামকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এখানে বাংলাদেশি ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক শক্তির সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা গেছে।
নিউহামে প্রথমঃ নিউহাম বরোতেও বাংলাদেশি প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। নির্বাচিত ১৯ জন বাংলাদেশি কাউন্সিলরের মধ্যে ১২ জন নিউহাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি থেকে, ৬ জন লেবার পার্টি থেকে এবং একজন গ্রিন পার্টির হয়ে জয় পেয়েছেন। আরও বড় খবর হলো, নিউহামের নতুন নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন। তিনি লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যের মূলধারার কোনো বড় রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি নির্বাহী মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।
রেডব্রিজ ও বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামঃ রেডব্রিজে নির্বাচিত বাংলাদেশি কাউন্সিলরদের মধ্যে ৯ জন লেবার পার্টি থেকে এবং ৫ জন স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম থেকে জয় পেয়েছেন। ইলফোর্ডকেন্দ্রিক বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রার্থীদের প্রভাব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামে নির্বাচিত বাংলাদেশি কাউন্সিলরদের মধ্যে ৮ জন লেবার ও ২ জন গ্রিন পার্টির হয়ে জয়লাভ করেন।
জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতিফলনঃ পূর্ব লন্ডনের বাইরে ইলিং, ক্রয়ডন, ব্রেন্ট এবং বার্মিংহামেও কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। আর টাওয়ার হ্যামলেটসের পার্লামেন্টারি দুটি আসনের এমপি রুশনারা আলী ও আফসানা বেগমও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতেও কমিউনিটির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
পরিসংখ্যান যা ব্যাখ্যা করেঃ অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশিদের অনুপাত প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ, নিউহামে ৪০-৫০ হাজার, রেডব্রিজে প্রায় ৩০ হাজার এবং বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতের বাস।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির নতুন প্রজন্ম এখন শুধু ভোটার হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের কেন্দ্রেও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। টাওয়ার হ্যামলেটস ও নিউহামে নির্বাহী মেয়র পদে বাংলাদেশি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং কাউন্সিলজুড়ে ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এবারের নির্বাচন সেই দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন বলে দেখা হচ্ছে।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এম.কে

