9.9 C
London
October 22, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে কিশোরদের বইয়ে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বিতর্কে চিকিৎসক

ব্রিটেনের জাতীয় স্মরণ দিবসে ব্যবহৃত পপি ফুলের প্রতীককে ফিলিস্তিনপন্থী নকশায় রূপ দিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানে শিক্ষিত এক এনএইচএস চিকিৎসক। আবদুল কাদের ইসমাইল (৪১) নামের ওই চিকিৎসক কিশোরদের জন্য ইসলামবিষয়ক বইও লিখেছেন, যেখানে শরিয়াহ আইনের অধীনে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল।

বার্মিংহামের বাসিন্দা ইসমাইল নিজেকে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি মুসলিম, দুই সন্তানের বাবা এবং কেক তৈরি ও ভৌতিক সিনেমার প্রতি আগ্রহী একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি পূর্ব মিডল্যান্ডসের বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করেছেন এবং নবজাতক চিকিৎসাবিষয়ক একাধিক গবেষণাপত্রের সহলেখক। তার অনলাইন জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, তিনি ২০১০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

ইসমাইলের তৈরি ‘প্যালেস্টাইন পপি’ ব্যাজে ১২টি পাপড়ির পপি ফুলের নকশার সঙ্গে ফিলিস্তিনের পতাকার রং ব্যবহার করা হয়েছে। ইবে-তে ব্যাজটির দাম রাখা হয়েছিল ১ পাউন্ড ৭৮ পেন্স। ওয়েবসাইটে এটিকে ফিলিস্তিনের নিপীড়িত ও দখলদারিত্বের শিকার মানুষের সঙ্গে সংহতির প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসমাইলের দাবি, ব্যাজ বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের পুরোটাই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদারিত্বের অবসানে কাজ করা দাতব্য সংস্থাগুলোকে দেওয়া হয়।

তবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য ও যুদ্ধফেরত ব্যক্তিদের একটি অংশের অভিযোগ, এই নকশা ব্রিটেনের স্মরণ দিবসের ঐতিহ্যবাহী প্রতীককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে রয়্যাল ব্রিটিশ লিজিয়নের পপি তহবিলে অর্থ সংগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংস্থাটি ঐতিহ্যবাহী দুই পাপড়ির পপি নকশার অধিকারী। রয়্যাল ব্রিটিশ লিজিয়ন নিজেদের অরাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করে এবং পপিকে বিভিন্ন মানুষ ও সম্প্রদায়ের ঐক্যের প্রতীক বলে উল্লেখ করেছে।

ইসমাইলের লেখা অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু চ্যালেঞ্জিং টপিকস ফর মুসলিম টিনস সিরিজের বইগুলোতে ইসলাম নিয়ে কিশোরদের উপযোগী আলোচনা রয়েছে। ডেইলি মেইল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিজের প্রথম খণ্ডে ব্যভিচারের মতো নিষিদ্ধ কাজ থেকে মুসলিমদের বিরত রাখতে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তিকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বইটিতে এমন এক ব্যক্তির ধর্মীয় কাহিনিও তুলে ধরা হয়েছে, যিনি পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য শাস্তি চেয়েছিলেন এবং মৃত্যুর পর জান্নাতের নদীতে সাঁতার কাটছেন বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বইয়ে ইসমাইল লিখেছেন, এসব শাস্তির উদ্দেশ্য মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শাস্তি প্রয়োগ না করার জন্য কোনো অজুহাত পাওয়া গেলে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়; আর শাস্তি কার্যকর হলেও তা পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তির সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সিরিজের দ্বিতীয় খণ্ডে সমকামী অনুভূতি ও লিঙ্গ-পরিচয়জনিত মানসিক অস্বস্তিকে ‘আল্লাহর পরীক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রার্থনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসমাইল একই সঙ্গে সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের নিপীড়নের বিরোধিতা করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, মুসলিমদের বসবাসের দেশের আইন মেনে চলা উচিত; নিজেরা শরিয়াহ আইন প্রয়োগের চেষ্টা করা উচিত নয়।

প্যালেস্টাইন পপি ওয়েবসাইটে এই ফুলকে ফিলিস্তিনের জাতীয় ফুল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১২ হাজার ফিলিস্তিনি নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ওয়েবসাইটের প্রচারমূলক ভিডিওতে ‘নদী থেকে সাগর পর্যন্ত, ফিলিস্তিন হবে স্বাধীন’ স্লোগানও রয়েছে। ইহুদি সংগঠনগুলোর একটি অংশ স্লোগানটিকে ইসরায়েল ধ্বংসের আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করে; তবে ফিলিস্তিনপন্থী সমর্থকেরা এটিকে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার দাবি হিসেবে ব্যবহার করেন।

ব্যাজ বিক্রির অর্থ পাওয়া দাতব্য সংস্থাগুলোর মধ্যে ‘ফ্রেন্ডস অব আল-আকসা’ রয়েছে। ডেইলি মেইল জানিয়েছে, ২০২৪ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি প্রতিবেদনে সংস্থাটিকে কট্টর বামপন্থী ও ইসলামপন্থী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইল প্যাটেল অতীতে ‘আমরা সবাই হামাস’ মন্তব্য করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং সামরিক সম্মাননা পাওয়া ট্রেভর কোল্ট এলবিসি রেডিওকে বলেছেন, তার মতে এই ব্যাজ কোনো ইতিবাচক অবদান রাখে না; বরং বিভেদ ও বিদ্বেষ তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ব্যাজ বিক্রির অর্থ থেকে সাবেক সেনাসদস্যদের সহায়তায় কোনো অর্থ যাচ্ছে না।

এর আগে লন্ডনে ব্যাটল অব ব্রিটেন স্মৃতিসৌধে ওঠার সময় ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের পপি ফুলের মালা মাড়ানোর ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ইসরায়েলে হামলার তিন বছর পূর্তির কয়েক দিন পর ওই ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্য স্পেকটেটর-এর প্রতিবেদনের বরাতে ডেইলি মেইল আরও জানিয়েছে, ইসমাইল গ্রিন পার্টির সদস্য এবং দলটির সম্মেলনে ‘জায়নবাদ বর্ণবাদ’ শীর্ষক একটি বিতর্কিত প্রস্তাবের সমর্থক ছিলেন। একই সম্মেলনে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে ইসরায়েলি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রমে যুক্ত করার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রয়্যাল ব্রিটিশ লিজিয়ন জানিয়েছে, মানুষ চাইলে বিভিন্ন ধরনের পপি ব্যাজ পরতে পারে। অন্যদিকে, ডেইলি মেইল জানিয়েছে, এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে আবদুল কাদের ইসমাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার কোনো জবাব উল্লেখ করা হয়নি।

সূত্রঃ ডেইলি মেইল\ দ্য স্পেকটেটর\ এলবিসি রেডিও

এমকে

আরো পড়ুন

হাসিনা সরকারের সদস্যদের সম্পদ তদন্তে ব্রিটেনকে অনুরোধ বাংলাদেশের

যুক্তরাজ্যে পার্কিং জরিমানায় বড় পরিবর্তনঃ গাড়িচালকদের জন্য ১০ মিনিটের ছাড়

বরিস জনসনকে প্রকাশ্যে মিথ্যাবাদী ও আইনভঙ্গকারী বললেন ব্রিটিশ কলামিস্ট