যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথ “ওয়ান ইন, ওয়ান আউট” অভিবাসন চুক্তি কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এই স্কিমের আওতায় ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো এক আশ্রয়প্রার্থী গোপনে আবার ব্রিটেনে ফিরে এসে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, তার মতো আরও অন্তত ১৮ জন ফেরতপ্রাপ্ত ব্যক্তি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে গোপনে বসবাস করছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর পর ওই আশ্রয়প্রার্থী মানবপাচারকারী চক্রের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। পরে প্রাণভয়ে তিনি আবারও অবৈধ পথে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসেন।
লরিতে করে পুনরায় ব্রিটেনে প্রবেশ করা ওই ব্যক্তি বলেন, “হোম অফিস আমাকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর পর পাচারকারীরা আমাকে জোর করে তাদের হয়ে কাজ করাতে চেয়েছিল। আমি রাজি না হওয়ায় তারা আমাকে নির্মমভাবে মারধর করে। এখনো আমার মুখে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।”
তিনি জানান, ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের তথাকথিত “জঙ্গল” শরণার্থী শিবিরে এখন ছোট নৌকার বদলে লরিতে করে ব্রিটেনে প্রবেশের প্রবণতা বাড়ছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “ওয়ান ইন, ওয়ান আউট” স্কিমের কারণে পাচারকারীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে।
তার ভাষায়, “ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পার হতে ১ থেকে ২ হাজার ইউরো লাগে, কিন্তু লরিতে করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছাতে খরচ হয় ৪ থেকে ৫ হাজার ইউরো।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কিমটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপার বন্ধ করা এবং মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা দমন করা। তবে বাস্তবে পাচারকারীরা এখন বেলজিয়াম থেকে বেশি যাত্রা পরিচালনা করছে এবং ফরাসি উপকূলে পুলিশের নজর এড়াতে বিকল্প রুট ব্যবহার করছে।
যদিও চলতি বছরে ইংলিশ চ্যানেল পারাপারের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে, তবে বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে সাম্প্রতিক প্রতিকূল আবহাওয়াও বড় কারণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত “ওয়ান ইন, ওয়ান আউট” স্কিমের আওতায় ৬০৫ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ৫৮১ জনকে যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছে।
বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা ওই আশ্রয়প্রার্থী বলেন, তিনি লন্ডনের বাইরে একটি শহরে বন্ধুর সহায়তায় একটি কক্ষে লুকিয়ে আছেন এবং খুব কমই বাইরে বের হন।
তিনি বলেন, “আমি পাচারকারী, পুলিশ এবং হোম অফিস—সবার কাছ থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার আর কোনো জীবন নেই। কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও নেই।”
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যদি আবার আমাকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে পাচারকারীরা আমাকে হত্যা করতে পারে। কারণ আমি তাদের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি।”
অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমি যুক্তরাজ্যে শান্তিতে থাকতে, বৈধভাবে কাজ করতে এবং নিরাপদ থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থা মানুষকে বাধ্য করছে আত্মগোপনে থাকতে এবং কখনও কখনও অপরাধের পথেও ঠেলে দিচ্ছে।”
এদিকে আরেকটি ঘটনায়, এক আশ্রয়প্রার্থী—যিনি বহিষ্কারের আশঙ্কায় গত জানুয়ারিতে নিজেই গোপনে যুক্তরাজ্য ত্যাগ করেছিলেন—সম্প্রতি হোম অফিস থেকে এমন একটি ইমেইল পেয়েছেন, যেখানে বোঝা যায় কর্তৃপক্ষ জানেই না যে তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
বর্তমানে ইতালিতে থাকা ওই ব্যক্তি বলেন, “হোম অফিস এখনো মনে করছে আমি ব্রিটেনেই আছি। অথচ আমি অনেক আগেই দেশ ছেড়েছি।”
অভিবাসী অধিকার সংগঠন জয়েন্ট কাউন্সিল ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব ইমিগ্র্যান্টস-এর প্রতিনিধি সিমা সাইয়েদা বলেন, “বর্তমান সীমান্তনীতি মানুষকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে এবং তাদের অপরাধীকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি দাবি করেন, আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ ভ্রমণপথ চালু করাই সংকট সমাধানের একমাত্র মানবিক উপায়।
তবে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এক মুখপাত্র বলেন, “ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর পর কেউ আবার যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করলে তারা সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় করছে। তাদের পুনরায় ফেরত পাঠানো হবে।”
হোম অফিস আরও দাবি করেছে, বর্তমান সরকারের অধীনে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে, বহিষ্কারের হার বেড়েছে এবং আশ্রয়প্রক্রিয়ার জট কমেছে।
সরকারের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সংগঠিত অভিবাসন অপরাধ দমনে রেকর্ডসংখ্যক অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং ২০২৪ সালের তুলনায় এসব কার্যক্রম এক-তৃতীয়াংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

