ব্রিটেনে আমদানিকৃত ডিমের সঙ্গে সম্পর্কিত সালমোনেলা প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি বা ইউকেএইচএসএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সালমোনেলা এন্টারিটিডিসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫২৮ জনে দাঁড়িয়েছে এবং তিনটি পৃথক ক্লাস্টারে এখন পর্যন্ত দুইজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
ইউকেএইচএসএ জানিয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৩০৫ জন t5.9411 ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত এবং এই ক্লাস্টারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও ১৮২ জন t0.24068 ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তৃতীয় ক্লাস্টার t5.9765-এ আক্রান্ত হয়েছেন ৪১ জন এবং সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
তদন্তে এখন পর্যন্ত এসব সংক্রমণের সঙ্গে বিদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে আমদানি করা ডিমের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তদন্ত এখনও চলমান এবং সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট উৎস চূড়ান্তভাবে শনাক্ত হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে উৎপাদিত ডিম আক্রান্ত—এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
আক্রান্তদের একটি বড় অংশ বাইরে খাবার খাওয়ার সঙ্গে যুক্ত। ছোট ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও টেকঅ্যাওয়ে ব্যবসা থেকে খাবার গ্রহণের পর এসব সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে বলে ইউকেএইচএসএ জানিয়েছে। ফলে রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানে আমদানিকৃত ডিম কীভাবে সংরক্ষণ, ব্যবহার ও রান্না করা হচ্ছে, তা নিয়েও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
সালমোনেলা সংক্রমণে সাধারণত ডায়রিয়া, পেটের খিঁচুনি বা ব্যথা, বমি এবং জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসুস্থতা তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
গুরুতর ক্ষেত্রে সালমোনেলা সংক্রমণ সেপসিসের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ কারণেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের খাবারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। তবে একই সঙ্গে ইউকেএইচএসএ বলেছে, সাধারণ জনগণের জন্য সামগ্রিক ঝুঁকি বর্তমানে কম।
ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি বা এফএসএর পরামর্শ অনুযায়ী, ডিম ভালোভাবে রান্না করা এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হলে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি কম থাকে। শিশু, ছোট বাচ্চা, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের কাঁচা বা অল্প রান্না করা ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণের সময় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের কাঁচা বা অল্প রান্না করা ডিমযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তাজা মেয়োনেজ, মুস ও হোল্যান্ডেইস সসের মতো খাবার। বাইরে খাওয়ার সময় ব্যবহৃত ডিম ব্রিটিশ লায়ন মার্ক বহন করে কি না বা ‘Laid in Britain’ স্কিমের আওতায় রয়েছে কি না জানা না গেলে ডিম সম্পূর্ণভাবে রান্না করা হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়াকে নিরাপদ পন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে সাধারণ মানুষকে রান্না ও খাবার তৈরির সময় পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। ডিম ও কাঁচা মাংস বা পোলট্রি ধরার পর ভালোভাবে হাত ধোয়া, প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী খাবার সংরক্ষণ করা এবং যথাযথ তাপমাত্রায় রান্না করা সালমোনেলা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্রুত বেড়েছে। আগস্টের শেষ দিকে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪৭৪; ১ সেপ্টেম্বরের হিসাবে তা বেড়ে ৫২৮ হয়েছে—অর্থাৎ নতুন করে আরও ৫৪টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন কোনো সাধারণ উৎস বা খাদ্যপণ্যের সঙ্গে সংক্রমণের সম্পর্ক পাওয়া যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আপাতত আমদানিকৃত ডিমের সঙ্গে যোগসূত্রই তদন্তের অন্যতম প্রধান দিক হয়ে রয়েছে।
ব্রিটেনে বসবাসকারী মানুষের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও টেকঅ্যাওয়ে থেকে ডিমযুক্ত খাবার খাওয়ার সময় কাঁচা বা অল্প রান্না করা ডিমের খাবার এড়িয়ে চলা এবং ডিম সম্পূর্ণভাবে রান্না করা হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া। একই সঙ্গে সালমোনেলার সম্ভাব্য উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রাদুর্ভাবের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমদানিকৃত ডিমের বিষয়ে সতর্কতা অব্যাহত থাকবে। ৫২৮ জন আক্রান্ত ও দুইজনের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করলেও, সরকারি সংস্থাগুলোর বর্তমান মূল্যায়ন অনুযায়ী সাধারণ জনগণের জন্য সামগ্রিক ঝুঁকি কম। তাই আতঙ্ক নয়—সঠিক খাদ্য নিরাপত্তা ও রান্নার নিয়ম মেনে চলাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্রঃ চ্যানেল-ফোর নিউজ
এম.কে

