TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের চাপ ও উগ্র ডানপন্থীদের বিক্ষোভে উত্তপ্ত গ্লাসগো

দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাগত জানানোর শহর হিসেবে পরিচিত স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো এখন আশ্রয়প্রার্থী, আবাসন সংকট ও অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক উত্তেজনার নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। শহরটিতে বর্তমানে ৩ হাজার ৯০০-এর বেশি আশ্রয়প্রার্থী অবস্থান করছেন—যা ওয়েলস, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।

স্থানীয় পর্যায়ে আবাসনের তীব্র সংকটের সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থীদের এই ঘনত্ব যুক্ত হওয়ায় গ্লাসগোর বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক উত্তেজনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডানপন্থী কর্মীরা শহরে মিছিল করলে মুখোশধারী তরুণদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় এক পণ্য সরবরাহকারী চালক বর্ণবাদী গালাগাল ও হামলার শিকার হন।

উত্তর গ্লাসগোর বিভিন্ন এলাকাতেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা সড়ক অবরোধ করে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসন ইস্যুতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া অসন্তোষের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তবে গ্লাসগোতে আশ্রয়প্রার্থীদের ঘনত্বের পেছনে শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের পুনর্বাসন নীতি নয়, স্কটল্যান্ডের নিজস্ব গৃহহীনতা আইনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

যুক্তরাজ্যের অন্য অংশে শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার পর কিছু ব্যক্তি স্কটল্যান্ডের দিকে চলে আসছেন। এর অন্যতম কারণ, স্কটল্যান্ডের স্থানীয় কাউন্সিলগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জরুরি আবাসনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কাউন্সিলগুলো একক ও ঝুঁকিমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এ ধরনের আবাসন সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

ফলে যুক্তরাজ্যের একই অভিবাসন ব্যবস্থার আওতায় থেকেও স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে আবাসন সহায়তার ক্ষেত্রে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্লাসগোর মতো বড় শহরে, যেখানে আগে থেকেই আবাসনের সংকট রয়েছে।

গ্লাসগো সিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, শরণার্থী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে হাজার হাজার গৃহহীনতার আবেদন জমা পড়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। একই সঙ্গে হোম অফিস আশ্রয় আবেদনগুলোর দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন করে আবাসনের চাপ তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো। রিফর্ম ইউকের উপনেতা গ্লাসগোকে ‘যুক্তরাজ্যের আশ্রয়প্রার্থীদের রাজধানী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে স্থানীয় অসন্তোষকে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে সামনে আনছেন।

তবে অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে। গ্লাসগোর কাউন্সিলর রোজা সালিহ জানিয়েছেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এখন একা চলাফেরা করতেও ভয় পাচ্ছেন। বর্ণবাদী হামলার ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন খাতে কর্মী সংকট মোকাবিলায় বিদেশি শ্রমিকদের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা মনে করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্লাসগোর বর্তমান পরিস্থিতি মূলত দুটি ভিন্ন নীতির সংঘাতকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে আশ্রয়প্রার্থীদের আগমন ও পুনর্বাসন কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, অন্যদিকে আবাসন, গৃহহীনতা ও স্থানীয় সেবার বড় অংশের দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর। ফলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের চাপ গিয়ে পড়ছে স্থানীয় সরকারের ওপর।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের আবাসন আইনের পার্থক্য। কোনো ব্যক্তি যুক্তরাজ্যের এক অংশে আবাসন সহায়তা না পেলেও অন্য অংশে তুলনামূলক বেশি সহায়তার সুযোগ পেলে অভ্যন্তরীণভাবে তাদের স্থানান্তর আরও বাড়তে পারে। এতে নির্দিষ্ট কিছু শহরের ওপর অসম চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্লাসগোর ঘটনাগুলো তাই শুধু একটি শহরের আবাসন সংকটের বিষয় নয়। এটি যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ অভিবাসন কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বণ্টন, আশ্রয়প্রার্থীদের পুনর্বাসন, আবাসন সক্ষমতা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা—সবকিছু নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

একই সঙ্গে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়লে সামাজিক সম্প্রীতি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আবাসন সংকট ও নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ দ্য ড্যাজলিং ডন

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রেক্সিট: যুক্তরাজ্যের খুচরা বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির শংকা

এক নজরে যুক্তরাজ্যের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন

মৌসুমি কর্মী নেবে যুক্তরাজ্য, যেভাবে যাবেন

নিউজ ডেস্ক