TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে বড় দুর্যোগের অশনিসংকেতঃ ঘরে ৩ দিনের খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ সরকারের

ব্রিটেনে সম্ভাব্য বড় ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে আগেভাগেই প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিচ্ছে সরকার। তীব্র আবহাওয়া, বন্যা, তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে অপরাধী বা হ্যাকারদের হামলা, বিদেশি শক্তির আক্রমণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিপর্যয়—বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিবারগুলোকে কয়েক দিনের জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে মজুত রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সরকারের নতুন জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় মানুষকে জরুরি সতর্কবার্তার সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসার মৌলিক জ্ঞান অর্জন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ নির্ধারণ এবং সংকটের সময় পরিবারের সদস্যদের করণীয় আগে থেকেই ঠিক করে রাখার পরামর্শ দেওয়া হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ফিলিপ ব্রডবেন্ট জানিয়েছেন, অ্যান্ডি বার্নহামের সরকার এমন একটি প্রচারণার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মাধ্যমে পরিবারগুলোকে দুর্যোগ মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত রাখার বিষয়ে উৎসাহিত করা হবে। এর মধ্যে চরম আবহাওয়া, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার মতো পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

সরকারের যুক্তি হলো, মানুষ যদি জরুরি পরিস্থিতির প্রথম কয়েক দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন নিজেরাই সামলাতে পারে, তাহলে জরুরি পরিষেবাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ পাবে। এজন্য ঘরে অল্প পরিমাণ টিনজাত খাবার ও বোতলজাত পানি রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রতিটি পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বর কাগজে লিখে রাখা, পরিবারের সদস্যদের জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা, নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা তৈরি করা, স্থানীয় ও জাতীয় বেতার কেন্দ্রের তরঙ্গসংখ্যা লিখে রাখা এবং বিমার কাগজপত্র সহজে পাওয়া যায় এমন জায়গায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বাড়ির গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের মূল সংযোগ কীভাবে বন্ধ করতে হয়, তা পরিবারের সদস্যদের জানা উচিত। জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারের সবাই কোথায় মিলিত হবে এবং কীভাবে যোগাযোগ করবে, সেটিও আগে থেকেই ঠিক করে রাখার পরামর্শ রয়েছে।

বাড়িতে অন্তত কয়েক দিনের জন্য জরুরি সামগ্রী এমন জায়গায় রাখতে বলা হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ না থাকলেও সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। দ্রুত বাড়ি ছাড়তে হলে ব্যবহারের জন্য আলাদা একটি জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখাও উপকারী হতে পারে। তবে আগুনের মতো তাৎক্ষণিক বিপদের ক্ষেত্রে কোনো সামগ্রী নেওয়ার চেষ্টা না করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জরুরি তালিকার প্রথমেই রয়েছে ব্যাটারি বা হাত ঘুরিয়ে চালানো টর্চ। বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে চলাচলের জন্য এটি প্রয়োজনীয়। মোমবাতির পরিবর্তে টর্চ ব্যবহার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মোবাইল ফোন সচল রাখতে একটি বহনযোগ্য বিদ্যুৎ সঞ্চয়যন্ত্র বা পাওয়ার ব্যাংক রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে মোবাইল ফোনই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটারি বা হাত ঘুরিয়ে চালানো বেতারযন্ত্রও জরুরি তালিকায় রয়েছে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলেও বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে সরকারি সতর্কবার্তা ও পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। গাড়ির বেতারযন্ত্রও ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে, যদিও ভয়াবহ আবহাওয়ার সময় নিরাপত্তার কারণে গাড়ির পরিবর্তে ঘরের ভেতরে অবস্থান করাই ভালো হতে পারে।

অতিরিক্ত ব্যাটারিও ঘরে রাখতে বলা হয়েছে। এগুলো টর্চ, বেতারযন্ত্র এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্সও জরুরি। এতে জলরোধী প্লাস্টার, ব্যান্ডেজ, থার্মোমিটার, জীবাণুনাশক, চোখ পরিষ্কারের দ্রব্য, জীবাণুমুক্ত ড্রেসিং, হাতের দস্তানা, চিকিৎসা টেপ ও চিমটির মতো সামগ্রী রাখা যেতে পারে।

পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য হাত জীবাণুমুক্ত করার তরল ও ভেজা টিস্যু কাজে আসতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বোতলজাত পানি মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বেঁচে থাকার জন্য একজন মানুষের প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন লিটার পানীয় পানির প্রয়োজন হতে পারে। রান্না ও মৌলিক পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে দৈনিক মাথাপিছু প্রায় ১০ লিটার পর্যন্ত পানির প্রয়োজন হতে পারে। শিশুদের খাবার তৈরি, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পোষা প্রাণীর জন্য অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হতে পারে।

জরুরি পরিস্থিতির জন্য এমন খাবার রাখতে বলা হয়েছে, যেগুলো দ্রুত নষ্ট হয় না এবং রান্নার প্রয়োজন নেই। টিনজাত মাছ, মাংস, বিনস, ফল ও সবজি, প্রস্তুত খাবার, বিস্কুট, ক্র্যাকার, বাদামের মাখন, সিরিয়াল, সিরিয়াল বার, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য দুধ এবং শুকনো ফল রাখা যেতে পারে। টিনজাত খাবার রাখলে সেটি খোলার জন্য টিন খোলার যন্ত্রও সঙ্গে রাখা প্রয়োজন।

শিশু থাকা পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। ডায়াপার, শিশুখাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কয়েক দিনের জন্য মজুত রাখা উচিত। পানি ফুটিয়ে বা বোতল জীবাণুমুক্ত করার সুযোগ না থাকলে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য শিশুখাদ্য বেশি উপযোগী হতে পারে।

পোষা প্রাণীর কথাও ভুলে গেলে চলবে না। জরুরি পরিস্থিতিতে দোকানপাট বন্ধ থাকলে বা বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে কয়েক দিনের জন্য তাদের খাবারও আগে থেকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

গাড়িতেও কিছু জরুরি সামগ্রী রাখা যেতে পারে। এর মধ্যে টর্চ, গাড়িতে মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার যন্ত্র, গরম কাপড়, কম্বল, সহজে চোখে পড়ার মতো উজ্জ্বল পোশাক, গাড়ির ব্যাটারি চালুর তার, খাবার ও পানীয় এবং তুষার সরানোর বেলচা থাকতে পারে। গাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স রাখাও উপকারী।

সাবেক ব্রিটিশ সেনাসদস্য ও ব্যক্তিগত তদন্তকারী ক্রিস থমাস জানিয়েছেন, এই প্রস্তুতির অর্থ আতঙ্কিত হয়ে বিপুল পরিমাণ খাবার কেনা নয়। শত শত পাউন্ড খরচ করে বিশেষ ধরনের দুর্যোগকালীন খাবার কেনারও প্রয়োজন নেই। বরং পরিবারে নিয়মিত খাওয়া হয় এমন খাবার কয়েক দিনের জন্য মজুত করাই বেশি বাস্তবসম্মত।

তার মতে, বিদ্যুৎ বা গ্যাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় রান্নার প্রয়োজন হয় না এমন খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তিন দিনের জন্য একজন মানুষের সকালের নাশতায় সিরিয়াল ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য দুধ বা সিরিয়াল বার, দুপুরে ক্র্যাকার ও টিনজাত মাছ বা বিনস এবং রাতে টিনজাত স্যুপ বা প্রস্তুত খাবার রাখা যেতে পারে। সঙ্গে শুকনো ফল, বিস্কুট বা সিরিয়াল বার রাখা যেতে পারে।

বিশেষ স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিদের খাবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ফার্মাসিস্ট আব্বাস কানানি। তার মতে, কয়েক দিনের খাবার মজুত করলেই হবে না; খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।

উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের অতিরিক্ত লবণযুক্ত টিনজাত স্যুপ, প্রক্রিয়াজাত মাংস, তাৎক্ষণিক নুডলস ও প্রস্তুত খাবার এড়িয়ে চলা বা কম লবণযুক্ত বিকল্প বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের খাবারে চিনি ও শর্করার পরিমাণের দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। ওটস, পূর্ণশস্য, বিনস, ডাল, বাদাম ও বীজের মতো খাবার রাখা যেতে পারে। টিনজাত ফল কিনলে চিনির সিরাপের পরিবর্তে প্রাকৃতিক রসে সংরক্ষিত ফল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের জন্য টিনজাত বিনস, ছোলা, ডাল, মাছ ও মাংসের মতো খাবার রাখা যেতে পারে। জরুরি খাদ্যভাণ্ডারে ওটস, কম লবণযুক্ত টিনজাত সবজি, ডাল, টিনজাত মাছ, প্রাকৃতিক রসে সংরক্ষিত ফল, লবণবিহীন বাদাম ও বীজ, পূর্ণশস্যের খাবার, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য দুধ এবং টিনজাত টমেটো রাখা যেতে পারে।

নিয়মিত ওষুধ ব্যবহারকারীদের কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় ওষুধ হাতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহারের নির্দেশনার কাগজের কপিও সংরক্ষণ করা উচিত। ব্যাটারিনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলে অতিরিক্ত ব্যাটারি চার্জ করে প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে ১০৫ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য ০৩৪৫৭ ৬৪৩৬৪৩ নম্বর দেওয়া হয়েছে।

সরকারের এমন প্রস্তুতি নির্দেশনা ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ব্রিটেনে কি বড় ধরনের কোনো সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে? তবে এই প্রস্তুতির পরামর্শকে কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ, হামলা বা দুর্যোগ আসন্ন হওয়ার সরকারি ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিভিন্ন সম্ভাব্য ঝুঁকি সামনে রেখে সাধারণ মানুষকে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখাই এর উদ্দেশ্য।

তবে বিদেশি শক্তির হামলা, সাইবার আক্রমণ, চরম আবহাওয়া, বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বিপর্যয়ের মতো একাধিক ঝুঁকিকে একই প্রস্তুতি পরিকল্পনার আওতায় আনার বিষয়টি ব্রিটেনে জরুরি পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সরকারের বার্তা হলো—আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা নয়, বরং পরিকল্পিত প্রস্তুতি। সংকটের প্রথম কয়েক দিন পরিবারগুলো যদি নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন নিজেরাই সামলাতে পারে, তাহলে জরুরি পরিষেবাগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে থাকা মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারবে।

সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস

এম.কে

আরো পড়ুন

কেয়ার ওয়ার্কার ভিসা প্রত্যাশীদের ব্যাপারে আসছে নতুন সিদ্ধান্ত

যুক্তরাজ্যে আর্থিক সংকটে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের তিন কোম্পানি

গাজায় মানবিক সংকটের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত