লন্ডনের ঐতিহাসিক বিগ বেন (এলিজাবেথ টাওয়ার)-এ উঠে টানা ১৭ ঘণ্টা অবস্থান করে ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী এক আন্দোলনকারীকে ১৪ মাসের কারাদণ্ড দিলেও তা দুই বছরের জন্য স্থগিত করেছেন আদালত। বিচারক বলেন, আদর্শিক অবস্থান বা রাজনৈতিক বিশ্বাস আইন ভঙ্গের বৈধতা দেয় না এবং আইনের শাসন সবার জন্য সমান।
৩০ বছর বয়সী ড্যানিয়েল ডে গত বছরের ৮ মার্চ ভোরে ওয়েস্টমিনস্টারে অবস্থিত এলিজাবেথ টাওয়ারে উঠে পড়েন। পরে টাওয়ারের মাঝামাঝি একটি কার্নিশে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে তিনি টানা ১৭ ঘণ্টা অবস্থান করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেন।
ঘটনার জেরে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার এলাকাজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ব্রিজ স্ট্রিট, ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ, পার্লামেন্ট স্কয়ারসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পথচারী চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় পুলিশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য, দমকল বাহিনী, প্যারামেডিক দল এবং একটি বিশেষ চেরি পিকার মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে টাওয়ারের নিচে ম্যাট্রেসও বিছিয়ে রাখা হয়, যাতে তিনি পড়ে গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে প্রসিকিউশন জানায়, এই ঘটনার কারণে করদাতাদের অন্তত £৯২ হাজার ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে পার্লামেন্টের ২ হাজার ৫০০টিরও বেশি দর্শনসূচি (ট্যুর) বাতিল হওয়ায় প্রায় £৬৭ হাজার ক্ষতি হয় এবং বাসের রুট পরিবর্তন ও চলাচল সীমিত করায় ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের প্রায় £২৫ হাজার রাজস্ব হারায়। এছাড়া ঘটনার সময় একদল সমর্থক একটি ফায়ার ইঞ্জিনের চলাচলও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়।
বিচারক টনি বাউমগার্টনার রায়ে বলেন, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ। অভিযুক্ত জানতেন তার কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তা ও জরুরি সেবার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি মন্তব্য করেন, এত উঁচুতে উঠে পড়ে গেলে শুধু নিজের নয়, অন্যদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।
তবে আদালত অভিযুক্তের ব্যক্তিগত পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় নিয়েছে। বিচারক বলেন, ড্যানিয়েল ডে-র দৃষ্টিশক্তি দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং ঘটনার পর থেকে তিনি আর কোনো অপরাধে জড়াননি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১৪ মাসের কারাদণ্ড দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।
একই সঙ্গে আদালত তাকে সর্বোচ্চ ২০ দিনের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া আগামী চার মাস তাকে ইলেকট্রনিক ট্যাগের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।
ড্যানিয়েল ডে বিচার চলাকালে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। পাশাপাশি পার্লামেন্ট ভবন ও সংশ্লিষ্ট সুরক্ষিত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগও তিনি স্বীকার করেন।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্যে জানা যায়, ঘটনার আগে তিনি টাওয়ারে ওঠার পরিকল্পনা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, বিশেষ পোশাক ও সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়েছিলেন এবং লাইভ সম্প্রচারের জন্য ক্যামেরারও ব্যবস্থা করেছিলেন। টাওয়ারে ওঠার সময় তিনি জুতা খুলে ফেলায় তার পা রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং সেই রক্ত টাওয়ারের পাথরেও লেগে ছিল।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক স্পষ্টভাবে বলেন, শক্তিশালী রাজনৈতিক বিশ্বাস বা নীতিগত অবস্থান থাকা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক হলেও তা আইন অমান্যের অনুমতি দেয় না। তিনি সতর্ক করে বলেন, কেউ যদি নিজেই ঠিক করতে শুরু করে কোন আইন মানবে আর কোনটি ভাঙবে, তাহলে আইনের শাসনই ভেঙে পড়বে।
স্থগিত কারাদণ্ডে মুক্তি পাওয়ার পর আদালত কক্ষেই উপস্থিত সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করেন ড্যানিয়েল ডে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

