TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ভিসা হারানোর ভয় নেই! নির্যাতনকারী নিয়োগকর্তা ছেড়ে নতুন চাকরির সুযোগ স্কিলড ওয়ার্কারদের

যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্ব ও কর্মক্ষেত্রে শোষণের শিকার অভিবাসী কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে হোম অফিস। স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় থাকা এবং আধুনিক দাসত্বের স্বীকৃত ভুক্তভোগীরা এখন তাদের শোষণকারী নিয়োগকর্তার চাকরি ছেড়ে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন, শুধু চাকরি পরিবর্তনের কারণে তাদের অভিবাসন-স্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়বে না। হোম অফিস আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় বিষয়টি তুলে ধরেছে।

হোম অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, “আধুনিক দাসত্বের কোনো ভুক্তভোগীকে তার অভিবাসন-স্থিতির কারণে শোষণকারী নিয়োগকর্তার কাছে আটকে থাকতে হবে না।” নতুন ব্যবস্থায় স্বীকৃত ভুক্তভোগীদের জন্য বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার মেয়াদ চলাকালীন অন্য নিয়োগকর্তার কাছে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

এর আগে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল নির্দিষ্ট স্পনসর ও নির্দিষ্ট চাকরির সঙ্গে কর্মীর অভিবাসন-অনুমতির সম্পর্ক। সাধারণ নিয়মে ভিসাধারী ব্যক্তি তার স্পনসর করা চাকরির বাইরে অন্য চাকরি করতে পারেন না। ফলে কোনো কর্মী যদি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে গুরুতর শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম কিংবা আধুনিক দাসত্বের শিকার হতেন, তাহলে চাকরি ছেড়ে দিলে ভিসা হারানোর আশঙ্কা তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত। নতুন পরিবর্তনটি এই ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই আনা হয়েছে।

নতুন নিয়মে কারা সুবিধা পাবেন?

এই সুবিধা সব স্কিলড ওয়ার্কার ভিসাধারীর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়। হোম অফিসের Competent Authority-এর মাধ্যমে যেসব কর্মীকে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে identified করা হয়েছে, মূলত তারাই নতুন বিধানের আওতায় পড়বেন।

হোম অফিসের ব্যাখ্যায়, এ ধরনের কর্মীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার বাকি সময়ের জন্য নির্দিষ্ট স্পনসরের সঙ্গে কাজ করার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ তারা অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের অধিকার পেয়ে যাবেন। তাদের বর্তমান অভিবাসন-অনুমতির মেয়াদ ও অন্যান্য প্রযোজ্য অভিবাসন শর্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?

অভিবাসন-স্থিতির সঙ্গে চাকরির সম্পর্ক অনেক সময় বিদেশি কর্মীদের নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তোলে। যুক্তরাজ্যের Migration Advisory Committee-ও অতীতে উল্লেখ করেছে যে অভিবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কের কারণে অভিবাসী কর্মীরা বিভিন্ন ধরনের শোষণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, বাজারদরের তুলনায় বেশি আবাসন খরচ এবং অন্যান্য শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ও রয়েছে।

আধুনিক দাসত্বের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। হোম অফিসের সাম্প্রতিক স্ট্যাটিউটরি গাইডেন্সে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমের ক্ষেত্রে শারীরিক সহিংসতা ছাড়াও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বা পুলিশের কাছে কর্মীকে রিপোর্ট করার হুমকি এক ধরনের ‘penalty’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এমনকি কোনো ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে কাজ করতে সম্মত হলেও যদি তার কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প না থাকে, তাহলে পরিস্থিতিটি forced labour-এর আওতায় পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্বের চিত্র কতটা বড়?

হোম অফিসের সর্বশেষ পূর্ণ-বছরের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে ২৩,৪১১ জন সম্ভাব্য আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগীকে National Referral Mechanism (NRM)-এ রেফার করা হয়। এটি ২০২৪ সালের ১৯,১১৭ জনের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি এবং ২০০৯ সালে NRM চালুর পর সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা।

২০২৫ সালের রেফারেলগুলোর মধ্যে ৭৭ শতাংশ বা ১৭,৯৯৯টি কেস Single Competent Authority-এর কাছে পাঠানো হয় এবং ২৩ শতাংশ বা ৫,৪১২টি কেস Immigration Enforcement Competent Authority-এর কাছে পাঠানো হয়। সবচেয়ে বেশি রেফার হওয়া জাতীয়তার মধ্যে ছিল যুক্তরাজ্যের নাগরিক, ইরিত্রিয়ার নাগরিক এবং ভিয়েতনামের নাগরিক।

২০২৬ সালেও প্রবণতাটি অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আরও ৬,০০৩ জন সম্ভাব্য ভুক্তভোগী হোম অফিসে রেফার করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।

বিশেষ করে বিদেশি কর্মীদের জন্য কেন বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ?

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সঙ্গে আধুনিক দাসত্ব ও শ্রমিক শোষণের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারি নির্দেশিকাতেও বিদেশি কর্মীদের আধুনিক দাসত্বের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা ও রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধানের ফলে কোনো স্বীকৃত ভুক্তভোগীকে শুধু ভিসা হারানোর ভয়েই শোষণকারী নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ চালিয়ে যেতে হবে না—এটাই পরিবর্তনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে ‘স্বীকৃত ভুক্তভোগী’ হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। শুধু নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই নতুন সুবিধাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে Home Office-এর নির্ধারিত Competent Authority-এর মাধ্যমে শনাক্ত হতে হবে।

যুক্তরাজ্যের NRM ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিষয়ে প্রথমে একটি reasonable grounds এবং পরবর্তী পর্যায়ে conclusive grounds সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো রয়েছে। হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা মামলার একটি ব্যাকলগ রয়েছে এবং সরকার ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেই ব্যাকলগ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অভিবাসী কর্মীদের জন্য বড় বার্তা

সামগ্রিকভাবে, নতুন পরিবর্তনটি স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সুরক্ষা যোগ করছে। কারণ একজন কর্মী যদি জানেন যে শোষণকারী নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি হারানোর পাশাপাশি তার ভিসাও বিপদে পড়তে পারে, তাহলে তিনি নির্যাতন বা শোষণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাতে ভয় পেতে পারেন।

নতুন নিয়মের লক্ষ্য হলো সেই ভয় কমানো—আধুনিক দাসত্বের স্বীকৃত ভুক্তভোগী যেন অভিবাসন-স্থিতির কারণে শোষণকারী নিয়োগকর্তার কাছে বন্দি হয়ে না থাকেন।

তবে কর্মীদের মনে রাখা প্রয়োজন, এটি সব ধরনের কর্মক্ষেত্রের বিরোধ বা সাধারণ চাকরির সমস্যা সমাধানের কোনো সাধারণ ছাড় নয়। নতুন সুরক্ষা মূলত হোম অফিসের মাধ্যমে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত হওয়া স্কিলড ওয়ার্কারদের জন্য প্রযোজ্য।

সূত্র: যুক্তরাজ্যের হোম অফিস, GOV.UK ও National Referral Mechanism-এর সরকারি পরিসংখ্যান।

এম.কে

আরো পড়ুন

বজ্রঝড়ে বিপর্যস্ত হতে পারে ইংল্যান্ড, জীবনহানির আশঙ্কায় মেট অফিসের সতর্কবার্তা

ব্রিটিশ যুবরাজই ‘সেক্সিতম টেকো’! তার নগ্ন ছবির সার্চ ৩২ হাজারেরও বেশি

যুক্তরাজ্যে নিম্ন-আয় এলাকায় সবচেয়ে খারাপ বায়ু দূষণঃ দারিদ্র্য সীমার এলাকায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি অব্যাহত