ইউক্রেনের কিয়েভ থেকে পোল্যান্ডের দিকে ফেরার পথে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ট্রেনের কয়েক মিনিট পরের একটি ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার সময় জনসন ও ইউরোপের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি একই রেলপথে চলাচল করছিলেন। জনসনের ট্রেন হামলার শিকার না হলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জনসন কিয়েভে ২০২৬ সালের ইয়াল্টা ইউরোপিয়ান স্ট্র্যাটেজির বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর ট্রেনে করে ফিরছিলেন। তার সঙ্গে একই ট্রেনে ছিলেন সাবেক সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ল বিল্ট এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা গুন্টার সাউটার।
কার্ল বিল্ট জানান, জনসনদের ট্রেনটি যে ট্রেনের কয়েক মিনিট পেছনে ছিল, সেটিই পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে রুশ ড্রোন হামলার শিকার হয়। হামলার সময় ট্রেনটি খালি করে দেওয়া হয় এবং এতে কেউ আহত হননি।
বিল্ট বলেন, তাদের ট্রেনেও সতর্কতামূলকভাবে যাত্রী সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ট্রেনটি দোরোহুস্কের দিকে যেতে সক্ষম হয়। তিনি ট্রেনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশংসা করলেও রাশিয়ার হামলা আরও তীব্র হচ্ছে বলে সতর্ক করেন।
হামলার পর বরিস জনসন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পোলিশ সীমান্তের কাছে একটি স্থির অবস্থায় থাকা ইউক্রেনীয় লোকোমোটিভে হামলা চালানোর পেছনে পুতিনের কী ধরনের ‘বিকৃত যুক্তি’ ছিল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
জনসন বলেন, ইউক্রেনীয়রা প্রতিদিন এ ধরনের ‘এলোমেলো ও অর্থহীন হামলার’ মুখোমুখি হচ্ছেন। তার দাবি, বেসামরিক রেলপথও রুশ হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আরও দাবি করেন, রাশিয়ার হামলায় এখন পর্যন্ত ইউক্রেনীয় রেলওয়ে সংস্থা উক্রজালিজনিতসিয়ার ১ হাজার ৭০০ কর্মী নিহত হয়েছেন। তিনি তাদের পাশাপাশি প্রতিদিন রেলপথে যাতায়াতকারী যাত্রীদেরও সাহসী বলে উল্লেখ করেন।
ইউক্রেনকে আরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জনসন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে আর কত সময় লাগবে এবং রুশ প্রেসিডেন্টের অর্থ জব্দ করে তা ইউক্রেনকে দেওয়া হচ্ছে না কেন।
জনসন বলেন, বেলজিয়ামের একটি ব্যাংক হিসাবে ১৪০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি এবং লন্ডনে প্রায় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড রয়েছে। ইউক্রেনকে সহায়তার ক্ষেত্রে ব্রিটেন নেতৃত্ব দিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে জয়ী হবে বলে তিনি মনে করেন এবং গত কয়েক দিন দেশটিতে অবস্থানের পর বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট হয়েছে। তবে ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সরঞ্জাম দেওয়া হলে যুদ্ধ আরও দ্রুত শেষ করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রুশ ড্রোন হামলার পর কিয়েভ-ওয়ারশ রেলপথে চলাচল ব্যাহত হয়। যে ট্রেনটিতে হামলা চালানো হয়, তাতে ২০০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন। হামলার স্থানটি পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে প্রায় এক মাইল দূরে ছিল।
ইউক্রেনীয় রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার ঘটনায় কোনো ব্যক্তি আহত হননি। ঘটনাস্থলের ছবিতে রেললাইনের কাছে বড় আগুনের গোলা এবং আকাশ আলোকিত করে ওঠা আগুনের শিখা দেখা যায়।
রাশিয়ার হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, মস্কো ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রেনে হামলা চালিয়েছে। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে রেল ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ করেন।
জেলেনস্কি বলেন, রুশ হামলা যেন ইউরোপের অন্য এলাকায় ছড়িয়ে না পড়ে, তা ঠেকাতেই ইউক্রেনের মানুষ প্রতিদিন লড়াই করছেন, জীবন দিচ্ছেন এবং আগ্রাসনকে আরও বিস্তৃত হতে দিচ্ছেন না।
এদিকে পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে সংঘাত আরও তীব্র করার অভিযোগ করেন। পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারচিন কিয়েরভিনস্কি জানান, একটি ড্রোন দোরোহুস্ক-ইয়াগোদিন সীমান্ত পারাপারের কাছে আঘাত হানে এবং অন্যটি যাত্রীবাহী ট্রেনে আঘাত করে।
কিয়েরভিনস্কি বলেন, ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ইউক্রেনের আকাশপথ বন্ধ থাকায় প্রতিবেশী পোল্যান্ডে যাওয়ার ট্রেনগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান পথ। এসব ট্রেনে প্রায়ই শরণার্থী, নারী ও শিশুরা যাতায়াত করেন।
ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর জানানো হয়নি। তবে ইন্টারসিটি জানিয়েছে, ট্রেন চলাচল ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় বিলম্বিত হয়। সীমান্ত যাচাই শেষ হওয়ার পর ট্রেনটি ওয়ারশের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখে।
রুশ হামলার ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের দূতরা ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিয়েভ ও মস্কো সফর করলেও ওই প্রচেষ্টায় বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য সান।
এম.কে

