Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

লন্ডনে প্রথমবার প্রজনন করছে ডেঙ্গু-জিকা ছড়াতে সক্ষম ‘বিপজ্জনক’ মশা

যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) প্রজাতির মশাকে প্রজনন করতে দেখা গেছে। ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস ছড়াতে সক্ষম এই আক্রমণাত্মক মশার পূর্ণবয়স্ক নমুনা ও লার্ভা পূর্ব লন্ডনের কয়েকটি আবাসিক এলাকায় শনাক্ত হওয়ার পর দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করেছে।

এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়। এটি ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং হলুদ জ্বরের মতো রোগের ভাইরাস বহন ও সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত এই মশার উপস্থিতি থেকে কোনো মানুষের সংক্রমিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

UK Health Security Agency (UKHSA) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাজ্যে এর আগে এই প্রজাতির মশা শনাক্ত হলেও এবারই প্রথম নিশ্চিতভাবে প্রমাণ পাওয়া গেল যে এটি দেশটির মাটিতে প্রজনন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে এডিস ইজিপ্টাই শনাক্ত হওয়ার এটি চতুর্থ ঘটনা।

মশাটির উপস্থিতি প্রথম শনাক্ত হয় UKHSA-এর Mosquito Watch নজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে। এরপর পূর্ব লন্ডনের সংশ্লিষ্ট এলাকায় মশা ধরার কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে এবং লার্ভা ধ্বংস করতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। UKHSA-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই মুহূর্তে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি খুবই কম। কারণ মশাটি কোনো রোগজীবাণু বহন করছে—এমন প্রমাণ নেই এবং এর কারণে স্থানীয়ভাবে মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু, জিকা বা অন্য কোনো সংক্রমণ ছড়ানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়নি।

UKHSA-এর মেডিক্যাল এনটোমোলজি ও জুনোসিস ইকোলজি বিভাগের প্রধান ড. জোলিয়ন মেডলক জানিয়েছেন, এডিস ইজিপ্টাই এমন দেশগুলোতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ছড়াতে পারে যেখানে এসব ভাইরাস আগে থেকেই সক্রিয়। কিন্তু পূর্ব লন্ডনে পাওয়া মশাগুলোর কারণে মানুষের সংক্রমণের কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত নেই।

তার মতে, এসব মশা সম্ভবত দুর্ঘটনাবশত যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছে। আক্রমণাত্মক মশা গাড়ি, লাগেজ কিংবা আমদানি করা গাছপালার সঙ্গে ‘হিচহাইক’ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছাতে পারে। কোনো এলাকায় আবহাওয়া অনুকূল হলে সেখানে কিছু সময়ের জন্য বেঁচে থাকা ও প্রজনন করাও সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বড় কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এডিস ইজিপ্টাই ঐতিহাসিকভাবে উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের মশা হলেও পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় মশাবাহিত রোগের বাহক প্রজাতিগুলোর বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের বর্তমান জলবায়ু এখনো এই মশার দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়, তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ পরিবেশবিদ্যার অধ্যাপক হিদার ফার্গুসন বলেছেন, ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে যুক্তরাজ্যে এসব রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশগত পরিস্থিতি যথেষ্ট অনুকূল নয়। তবে উষ্ণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি পরিবর্তিত হতে পারে। তার মতে, মশাটিকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে না দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনার ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. সিজার লোপেজ-কামাচোও সতর্ক করেছেন যে মশার উপস্থিতি এবং মশাবাহিত ভাইরাসের উপস্থিতি এক বিষয় নয়। কোনো রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার জন্য একই সঙ্গে সক্ষম মশা, উপযুক্ত পরিবেশ এবং সংক্রমিত ব্যক্তির মতো একাধিক বিষয় প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া এখনো এডিস ইজিপ্টাইয়ের দীর্ঘমেয়াদি বিস্তারের পথে বড় বাধা। সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের কারণে স্থানীয়ভাবে মশাটির প্রজননের সুযোগ তৈরি হলেও দেশটির সামগ্রিক জলবায়ু এখনো দীর্ঘমেয়াদে এর টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত ঠান্ডা। উত্তর ইউরোপে এ প্রজাতির স্থায়ীভাবে টিকে থাকার নজিরও এখনো নেই।

তবে UKHSA মনে করছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে এ ধরনের আক্রমণাত্মক মশার ঘটনা আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন মশা প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনাও বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে এসব মশা যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে বাড়ির বাগান ও আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছে UKHSA। বালতি, ফুলের টব, বিভিন্ন পাত্র বা অন্য যেকোনো স্থানে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পানিও মশার প্রজননের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। তাই নিয়মিত এসব স্থান পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

বিদেশি অর্থে রিফর্ম ইউকের রাজনৈতিক ‘খেলা’! গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়লেন নাইজেল ফারাজ

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজকে ঘিরে একটি গোপন ক্যামেরার তদন্ত। চ্যানেল ফোর নিউজের যাচাই করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমন একটি পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন, যার মাধ্যমে একটি মার্কিন কোম্পানিকে ব্যবহার করে রিফর্ম ইউকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিনটি রাজনৈতিক জরিপের অর্থ পরিশোধ করা হয়। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী অর্থায়ন ও বিদেশি অনুদানসংক্রান্ত আইন।

এক বছর ধরে পরিচালিত এই অনুসন্ধানটি করেছে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান ভারবেটিম। তাদের প্রতিবেদনে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথন ও বৈঠকের ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে। চ্যানেল ফোর নিউজ জানিয়েছে, তারা অনুসন্ধানের তথ্য ও ফুটেজ বিস্তারিতভাবে যাচাই করেছে।

তদন্তে বলা হয়েছে, রিফর্ম ইউকের নীতি বিভাগের প্রধান জেমস অর এবং ফারাজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ড্যান জুকস একজন গোপন প্রতিবেদকের সঙ্গে এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন, যাতে তিনটি রাজনৈতিক জরিপের অর্থ একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া যায়। ওই প্রতিবেদককে একজন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ধনী ব্যক্তির ছেলে হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছিল। অর ও জুকস ধারণা করেছিলেন, ওই মার্কিন কোম্পানিটি প্রতিবেদকের আমেরিকান বাবার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপগুলোর মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ পাউন্ড। জরিপগুলো পরিচালনা করে ব্রিটিশ পোলিং প্রতিষ্ঠান JL Partners। পরবর্তী সময়ে এসব জরিপ জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তার পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করে বলে তদন্তকারীদের দাবি।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে জুলাই মাসে ফারাজের ক্ল্যাকটন নির্বাচনী এলাকায়। গোপন প্রতিবেদকদের সঙ্গে বৈঠকে ফারাজ ওই জরিপগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। অনুসন্ধানে প্রকাশিত ফুটেজ অনুযায়ী, তিনি বলেন—“It worked. Boom!” অর্থাৎ, “কাজ হয়ে গেছে, বুম!”

তদন্তকারীদের অভিযোগ, সমস্যাটি শুধু জরিপের অর্থ কে দিয়েছে তা নিয়ে নয়; বরং অর্থের প্রকৃত উৎস ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা গোপন রাখার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী অর্থায়নবিধি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। ব্রিটিশ নির্বাচনী আইনে রাজনৈতিক দলকে দেওয়া নির্দিষ্ট অনুদান অবশ্যই অনুমোদিত উৎস থেকে আসতে হয়। বিদেশি উৎস থেকে রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

অভিযোগ প্রকাশের পর বিষয়টি আরও গুরুতর রূপ নেয়। রিফর্ম ইউকের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ পুলিশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও বিষয়টি তদন্তের দাবি উঠেছে।

তবে রিফর্ম ইউকে অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির বক্তব্য, তদন্তটি বিভ্রান্তিকর এবং বিদেশি অর্থ বা সুবিধা সরাসরি দলের কাছে পৌঁছায়নি। দলটি আরও দাবি করেছে, দলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার বাইরে থেকে পরিচালিত কোনো জরিপের ক্ষেত্রে সেটিকে দলীয় অনুদান হিসেবে ঘোষণা করার প্রয়োজন ছিল না।

জেমস অরও কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে রিফর্ম ইউকে জানিয়েছে, তারা বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে এবং তাদের দাতাদের যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন রিফর্ম ইউকে এবং নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে আগেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। দলটির বড় অঙ্কের অনুদান এবং বিদেশে অবস্থানকারী ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ নিয়েও এর আগে তদন্ত ও রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। ফলে নতুন এই অভিযোগ রিফর্ম ইউকের অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে।

সূত্রঃ চ্যানেল ফোর নিউজ

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

গঙ্গা চুক্তি ঘিরে ভারতের ওপর বড় চাপঃ বাংলাদেশের সঙ্গে পানির হিসাব এবার বিহারকেন্দ্রিক

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের বিহার রাজ্যের পানির চাহিদা ও স্বার্থকে বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে ‘উপযুক্ত পদক্ষেপ’ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে দেশটির বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এ আশ্বাস দিয়েছেন ক্ষমতাসীন জোটের শরিক জনতা দল ইউনাইটেডের (জেডিইউ) কার্যকরী সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝাকে লেখা এক চিঠিতে। গত ৬ আগস্ট রাজ্যসভায় বিহারের পানির বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার দাবি জানান সঞ্জয় ঝা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের সময় বিহারের পানির স্বার্থ নিশ্চিত করার দাবি তোলেন তিনি।

এরপর গত ২৮ আগস্ট সঞ্জয় ঝাকে চিঠি দেন জয়শঙ্কর। চিঠিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে সঞ্জয় ঝার উদ্বেগ তারা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন। চুক্তিটির বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ দিকগুলো সার্বিকভাবে পর্যালোচনার জন্য ভারতের পানিশক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জয়শঙ্কর আরও জানান, ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট ও ৩০ অক্টোবর এবং ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ ও ৩১ মে অনুষ্ঠিত পরামর্শসভাগুলোতে বিহার সরকারের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। এসব সভায় বিহারের পানীয় জল ও শিল্পকারখানার পানির চাহিদাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে জয়শঙ্কর বলেন, এসব বিষয় মাথায় রেখেই ভারত সরকার উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিহারের পানির চাহিদা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি ৩০ বছর মেয়াদি। চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির প্রবাহ বিবেচনা করে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টনের ব্যবস্থা রয়েছে। চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে ভারতের জোটসঙ্গী জেডিইউ দীর্ঘদিন ধরে বিহারের জন্য গঙ্গার পানিতে আরও ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়ে আসছে। সঞ্জয় ঝা বলেছেন, বিহার কোনো অনুগ্রহ চাইছে না; বরং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে এমন পানির হিস্যা চায়, যাতে আগামী ৩০ বছরে রাজ্যটির প্রায় ১৩ কোটি মানুষ পানীয় জল, সেচ ও শিল্পের পানির সংকটে না পড়ে।

জয়শঙ্করের চিঠির প্রতিক্রিয়ায় সঞ্জয় ঝা বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাস বিহারের প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বস্তির বিষয়। একই সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তাতে বিহারের স্বার্থ যেন পূর্ণাঙ্গ ও ন্যায্যভাবে বিবেচিত হয়—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

সঞ্জয় ঝা আরও বলেন, গঙ্গা ও এর উপনদীগুলোর পানিতে বিহারের জন্য সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবি জেডিইউ অব্যাহত রাখবে। এর আগে পানিসম্পদমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি এবং বিহারের জন্য ন্যায্য বরাদ্দের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বিহারের অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়টি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবার চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিহারের পানির চাহিদাকে কীভাবে বিবেচনা করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গঙ্গার পানিবণ্টন শুধু দুই দেশের আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, নৌপথ ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত। ফলে ১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন কোনো ব্যবস্থা বা চুক্তি হলে সেখানে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিই ঢাকার অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।

সূত্রঃ দ্য ইকোনমিক টাইমস, হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

বাংলাদেশে মন্ত্রীর গাড়ির বিরুদ্ধেই ট্রাফিক মামলাঃ ৬ হাজার টাকা জরিমানা

রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ব্যবহৃত গাড়ির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে ট্রাফিক পুলিশ। একই সঙ্গে গাড়িটির চালককে মোট ৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর গাড়ির বিরুদ্ধেই আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা ও জরিমানার ঘটনায় বিষয়টি বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর সার্কিট হাউজ রোডে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রীর গাড়িটি নির্ধারিত লেন না মেনে চলছিল। পরে সচিবালয়ের সামনে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সার্জেন্ট গাড়িটি থামিয়ে দেন।

ট্রাফিক পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, বেপরোয়া ও ভুল লেনে গাড়ি চালানোর কারণে চালক আরিফ হোসেনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়। দুই মামলায় মোট ৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঘটনার সময় মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত নিজেও গাড়িটির ভেতরে ছিলেন।

তবে ঘটনার পর মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়াই বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। নিজের ব্যবহৃত গাড়ি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করায় তিনি দুঃখ প্রকাশ ও অনুতপ্ত হন। একই সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ তার গাড়ির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।

মন্ত্রী জানান, তিনি এ ঘটনায় ‘খুশি’। কারণ তার মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে আইন সবার জন্য সমান এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

সরকারের একজন মন্ত্রীর গাড়ি আইন ভঙ্গের অভিযোগে আটক করে মামলা ও জরিমানা করার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্ন ধরনের বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গাড়ি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলেও অনেক সময় ছাড় পাওয়ার যে ধারণা রয়েছে, এই ঘটনা তার বিপরীত একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।

মন্ত্রীও বিষয়টিকে আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা থাকা উচিত নয়।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, একজন মন্ত্রীর গাড়ির বিরুদ্ধেই যখন ট্রাফিক পুলিশ আইন অনুযায়ী মামলা করতে পারে, তখন সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রেও ট্রাফিক আইন প্রয়োগ আরও কঠোর ও সমানভাবে হওয়া উচিত।

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে লেন মেনে চলা, বেপরোয়া গাড়ি চালানো বন্ধ করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে।

সব মিলিয়ে, মন্ত্রীর গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানার ঘটনাটি শুধু একটি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির গাড়ির ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগের একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।

সূত্রঃ প্রথম আলো\ স্টার নিউজ\ বিডিনিউজ২৪

এম.কে

Categories
বাংলাদেশ

আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন দিগন্তঃ বিশ্বমঞ্চে ঢাকার জন্য অপেক্ষা করছে বড় সুযোগ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সাম্প্রতিক চিঠিকে ঘিরে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চিঠির তাৎক্ষণিক বিষয় বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত হলেও এর ভাষা ও সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে।

চিঠিতে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পর্ক শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উড়োজাহাজ কেনার পর রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা চুক্তির মতো বিষয় যুক্ত থাকে। ফলে এই ক্রয়াদেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ চাইলে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল বা এমআরও খাতের উন্নয়নেও এ সম্পর্ক কাজে লাগাতে পারে। পাশাপাশি দক্ষ প্রকৌশলী ও কারিগরি জনশক্তি তৈরি, প্রশিক্ষণ এবং উড়োজাহাজ-সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পৃথক সহযোগিতা কাঠামো প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের কাছাকাছি অবস্থান, আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও চীনের বড় ধরনের অংশগ্রহণ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাব্য অংশীদার। ফলে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঢাকার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখী অংশীদারত্বের কৌশল আরও গুরুত্ব পেতে পারে। অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির বলয়ে আবদ্ধ না হয়ে প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পৃথক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা। চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজার সুবিধা নেওয়া এমন কৌশলের অংশ হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ যেন চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে বিবেচিত না হয়, আবার বেইজিংয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাও যেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ না হয়—এ বিষয়টি ঢাকার কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ট্রাম্প ও তারেক রহমানের মধ্যে ভবিষ্যতে সরাসরি বৈঠক হলে আলোচনার পরিধি বোয়িং কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণেরও বড় সুযোগ রয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়া এবং উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে দেশের শিল্পায়ন ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিরক্ষা খাতেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহে বহুমুখী অংশীদারত্ব বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না করে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ট্রাম্পের চিঠিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক যোগাযোগের ইঙ্গিত হিসেবে এটিকে দেখা যেতে পারে। তবে চিঠির বক্তব্যকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পরিবর্তিত হলেও যাতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা অব্যাহত থাকে, সে জন্য কংগ্রেস, পররাষ্ট্র দপ্তর, ব্যবসায়ী মহল, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন স্তরে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

একইভাবে চীনের সঙ্গেও রাজনৈতিক যোগাযোগের বাইরে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের চিঠিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক পরিবর্তনের ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তও এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকে পড়ার প্রমাণ নয়। তবে চিঠিটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা এবং ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে কাজে লাগানো। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো পক্ষের অনুসারী না হয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিটি অংশীদারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করাই ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বোয়িং কেনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে নতুন যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, সেটি ভবিষ্যতে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্কের সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে সামনে রেখে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে তার ওপর।

সূত্রঃ নিউ এজ, বাসস

এম.কে

Categories
আন্তর্জাতিক যুক্তরাজ্য (UK)

ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে মন্তব্যঃ ব্রিটিশ ডানপন্থীদের তোপের মুখে নেতানিয়াহুর ছেলে

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের বিরোধে মন্তব্য করে ব্রিটিশ ডানপন্থী রাজনীতিকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফকল্যান্ডকে আর্জেন্টিনার ভূখণ্ড বলে মন্তব্য করার পর তার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাজ্যের কয়েকজন ডানপন্থী রাজনীতিক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া এক পোস্টে ইয়াইর নেতানিয়াহু লেখেন, ‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার।’ এরপর ধারাবাহিক কয়েকটি পোস্টে তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের নীতির সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ব্রিটেন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ অবস্থান হিসেবে তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগও আনেন।

ইয়াইর আরও দাবি করেন, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলেই ইসরায়েলপন্থি অবস্থান নেওয়ায় আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন থাকা উচিত। তার এই অবস্থানই মূলত ব্রিটিশ ডানপন্থী রাজনীতিকদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।

যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী দল রিস্টোর ব্রিটেনের নেতা রূপার্ট লো ইয়াইরের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, ফকল্যান্ড ব্রিটিশ এবং ভবিষ্যতেও ব্রিটিশই থাকবে। প্রয়োজন হলে দ্বীপপুঞ্জ রক্ষায় যুদ্ধ করার কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে ইয়াইরকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন এই ব্রিটিশ রাজনীতিক।

সাবেক কনজারভেটিভ এমপি স্যার কনর বার্নসও ইয়াইরের মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী রাজনৈতিক মহলে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ও দেশটির ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে ফকল্যান্ড যুদ্ধও হয়েছিল। যুদ্ধের পর দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেনের কাছেই রয়েছে। তবে আর্জেন্টিনা এখনো ফকল্যান্ডের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি করে আসছে।

এদিকে ইয়াইর নেতানিয়াহু ইসরায়েল সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে নেই। ফলে তার বক্তব্যকে সরাসরি ইসরায়েল সরকারের সরকারি অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ফকল্যান্ড নিয়ে ইয়াইরের মন্তব্যের বিষয়ে ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হয়নি।

তবে ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন গাজা ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। ফলে নেতানিয়াহুর ছেলের ফকল্যান্ড-সংক্রান্ত মন্তব্য নতুন করে ব্রিটিশ-ইসরায়েল সম্পর্কের রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

বিশেষ করে ব্রিটিশ ডানপন্থী মহলের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনশীল হওয়ায় ইয়াইরের মন্তব্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রকাশ্য বিরোধটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ আল জাজিরা, হারেৎজ ও দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এম.কে

Categories
আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ

মোদি-পেজেশকিয়ান বৈঠকের পর ভারতকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বৈঠকের পর নয়াদিল্লি-তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও এমন কোনো চুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন না বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে কোনো দেশ তেহরানকে সহায়তা করলে ওই দেশের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এনডিটিভি জানায়, দ্য ব্রায়ান কিলমিড শো-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও ভারত ও ইরানের মধ্যে নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নাকচ করেন। তার ভাষ্য, বিশ্বের প্রতিটি দেশই নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। ইরানের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ রয়েছে, একইভাবে ওয়াশিংটনেরও তেহরানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

তবে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন রুবিও। তিনি বলেন, কোনো দেশেরই উচিত হবে না ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

রুবিও সতর্ক করে বলেন, কোনো দেশ যদি ইরানকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে দেয় কিংবা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের পথ সহজ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ওই দেশের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা নীতিকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করলে ভারতসহ যেকোনো দেশই মার্কিন ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে পারে—এমন বার্তাই দিয়েছেন তিনি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের সতর্কবার্তারও প্রতিফলন দেখা যায়। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা সীমিত করা এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর চাপ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে।

রুবিও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। এ লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটন মূলত অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকারও যুক্তরাষ্ট্র সংরক্ষণ করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন রুবিও। তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক হামলা এবং ভবিষ্যতে আরও হামলার সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে আসে।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের নতুন কৌশল ওয়াশিংটনের ভিত্তিকে চূর্ণ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে মোদি-পেজেশকিয়ান বৈঠকের পর ভারত-ইরান সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে যে কূটনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নয়াদিল্লি যদি তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়, তবে সেটি যেন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানকে সুবিধা দেওয়ার পর্যায়ে না যায়—ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বার্তায় মূলত সেই সতর্কতাই উঠে এসেছে।

সূত্রঃ এনডিটিভি

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

ট্রাম্পের ফকল্যান্ড বার্তায় ব্রিটেনে আতঙ্কঃ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কি দ্বীপ রক্ষা করতে পারবে লন্ডন

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই বক্তব্যের পরই ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দেশটির নিরাপত্তা-নির্ভরতা এবং আর্জেন্টিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ফকল্যান্ড বিরোধ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্য ব্রিটেনকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন ও ইরান থেকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির পাশাপাশি ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনার নতুন করে কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ফকল্যান্ড ইস্যুতে আরও সরব হয়েছেন। তিনি দ্বীপগুলোকে আর্জেন্টিনার জাতীয় স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ‘পবিত্র’ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং জানিয়েছেন, তার দেশ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখবে।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ১৯৮২ সালে যুদ্ধ হয়েছিল। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা তৈরি করেছে।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সব ধরনের নীতিগত অবস্থানই পর্যালোচনা করেন। তার এই মন্তব্যকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য লন্ডনের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের মাধ্যমে নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকারের ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ন্যাটোতে অবদান বাড়ানোর চাপ তৈরির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে ব্রিটেনে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। কনজারভেটিভ নেতা কেমি বেডেনক সতর্ক করে বলেছেন, শক্তিশালী দেশগুলো সাধারণত আক্রমণের লক্ষ্য হয় না—দুর্বল দেশগুলোই বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তার বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ব্রিটেনকে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

লেবার পার্টির এমপি এবং হাউস অব কমন্সের প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান তান সিং ধেসি-ও প্রধানমন্ত্রী বার্নহামকে সতর্ক করেছেন যে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা ‘ভালো অনুভূতি’ দিয়ে ব্রিটেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য প্রয়োজন বাস্তব অর্থায়ন ও সামরিক প্রস্তুতি।

প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে সরকারের ওপর চাপের অন্যতম কারণ হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশ ব্যয় করার লক্ষ্য। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রাকে আর বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি ২০৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করাও অতিরিক্ত ধীরগতির হতে পারে বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

তবে এখানে রয়েছে বড় আর্থিক সংকট। ব্রিটিশ সরকারের হাতে সীমাহীন অর্থ নেই। প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। এ কারণেই প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর প্রশ্নটি শুধু সামরিক নয়, বরং বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

কনজারভেটিভ পার্টি ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় ৩ শতাংশে নেওয়ার জন্য বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছে। দলটি এর অর্থায়নের জন্য কল্যাণ ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার সমালোচকেরা সতর্ক করেছেন, কল্যাণ ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট সামাজিক সংকট বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিও ব্রিটেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে ন্যাটো সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্যে সম্মত হয়েছিল—এর মধ্যে অন্তত ৩.৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষা খাতে যাওয়ার কথা।

এই পরিস্থিতিতে ফকল্যান্ড ইস্যু শুধু ব্রিটেন-আর্জেন্টিনা বিরোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখন—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ছাড়া ব্রিটেন কি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারবে?

আর্জেন্টিনা অবশ্য সামরিক সংঘাতের ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মিলেইর সাম্প্রতিক বক্তব্যে ফকল্যান্ড ইস্যুকে আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন যদি সত্যিই দীর্ঘদিনের মার্কিন অবস্থান পরিবর্তনের দিকে এগোয়, তাহলে ব্রিটেনের জন্য কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার হুমকি। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে মস্কোর সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা বা অন্যান্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে রাশিয়ার হুমকির খবরও সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে। ফলে লন্ডনের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীদের কাছে একই সময়ে একাধিক সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীন ও ইরানকেও সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু ফকল্যান্ড রক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইউরোপ ও বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য কতটা সামরিকভাবে স্বনির্ভর থাকবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ফকল্যান্ড-সংক্রান্ত মন্তব্য ব্রিটিশ সরকারের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে সীমিত সরকারি অর্থ, অন্যদিকে বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি। এর মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহাম সরকারের ওপর চাপ—প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা।

ফলে ফকল্যান্ড সংকট আপাতত নতুন কোনো যুদ্ধের ঘোষণা না হলেও, এটি ব্রিটেনের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নির্ভরতা কতটা কমিয়ে ব্রিটেন নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারবে—আগামী দিনগুলোতে সেটিই হতে পারে বার্নহাম সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট \ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

‘সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরছে’—ছোট নৌকায় অভিবাসন কমেছে, রেকর্ড প্রত্যাবাসনে বার্নহ্যামের বড় ঘোষণা

ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের প্রবণতা কমে আসায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রগুলোর পরিবর্তিত কৌশলের কারণে এ বিষয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বার্নহ্যাম বলেন, তিনি রাজনীতিকে “ভিন্নভাবে” পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তার সরকারের কর্মকাণ্ডের পক্ষে কয়েকটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তার দাবি, চলতি বছরের গ্রীষ্মে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসার সংখ্যা ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও চ্যানেল পারাপারে উল্লেখযোগ্য পতনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Migration Observatory-এর হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে প্রায় ১৪,২০০ মানুষ ছোট নৌকায় চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন—২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কম। ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে মোট আগমন ছিল প্রায় ৩০,২০০ জন।

সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, যুক্তরাজ্যে থাকার আইনগত অধিকার নেই—এমন ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, বার্ষিক প্রত্যাবাসনের সংখ্যাও ২০১৬ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন ও যাদের থাকার অনুমতি নেই, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য হোটেলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে বার্নহ্যাম দাবি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। সর্বশেষ পরিসংখ্যানেও হোটেল ব্যবহারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। একই সময়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ২১ শতাংশ কমে প্রায় ৮৬ হাজারে নেমেছে।

তবে ছোট নৌকায় আসা প্রত্যেক ব্যক্তিকে সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে—এমন ধারণা পরিসংখ্যান সমর্থন করে না। সংসদীয় গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছোট নৌকায় আসা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৯,৭০০ জনকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা মোট আগমনের প্রায় ৫ শতাংশ।

চ্যানেল সংকট মোকাবিলায় এবার ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ অভিযান আরও জোরদার করছে ব্রিটেন। নতুন করে ৭৫ সদস্যের একটি বিশেষ ইউনিট উত্তর ফ্রান্সে কার্যক্রম শুরু করেছে। পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিশেষ দলের সদস্যসংখ্যা ১৮ থেকে বাড়িয়ে ৩০ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ফ্রান্সের পশ্চিম উপকূলে আরও ৪৫ জন কর্মকর্তা মোতায়েন করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে উত্তর ফ্রান্সে ছোট নৌকা ঠেকাতে নিয়োজিত ফরাসি কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ১,০৫০ জনে পৌঁছাবে। ব্রিটিশ সরকারের ভাষ্য, মানবপাচারকারীরা এখন আগের কৌশল বদলে বড় আকারের নৌকা ব্যবহার করছে এবং ক্যালের আশপাশের পরিবর্তে আরও পশ্চিমের উপকূল থেকে নৌকা ছাড়ার চেষ্টা করছে।
এই পরিবর্তিত কৌশলই এখন ব্রিটিশ ও ফরাসি কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারকারীরা অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক কিন্তু বড় নৌযানে বেশি মানুষ তুলছে। কিছু নৌযানে দুই শতাধিক মানুষ পরিবহনের ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে মোট নৌকা কমলেও প্রতিটি নৌযানের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়ছে।

বার্নহ্যাম তার বক্তব্যে এ কারণেই সতর্ক করে বলেছেন, মানবপাচারকারী চক্রগুলো ক্রমাগত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। ফলে সরকারকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে অপরাধীদের “এক ধাপ এগিয়ে” থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ছোট নৌকার মাধ্যমে অভিবাসন সংকট শুধু ব্রিটেনের একার সমস্যা নয়; এটি একটি সম্মিলিত ইউরোপীয় চ্যালেঞ্জ। তাই ফ্রান্সসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করেই সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে ছোট নৌকা ঠেকাতে চালু থাকা ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ ব্যবস্থা নিয়েও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সংসদীয় গবেষণা অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার আওতায় ১,০৮৭ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ফ্রান্স থেকে ১,১১৭ জনকে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে। এই পাইলট ব্যবস্থার মেয়াদ ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের সময়ও ছোট নৌকা সংকট গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। ব্রিটিশ ও ফরাসি নেতৃত্বের যৌথ প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানবপাচারকারী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, নৌকা ছাড়ার আগেই তা ঠেকানো এবং বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার জন্য অভিবাসীদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া বন্ধ করা।

তবে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। চলতি বছর আগমন কমলেও ২০১৮ সাল থেকে ছোট নৌকায় আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয় আবেদন, প্রত্যাবাসন এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান—সবকিছুই সরকারের জন্য বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছোট নৌকায় আসা ব্যক্তিদের করা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার আশ্রয় আবেদনের মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজারের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল; এর ৫৯ শতাংশে সুরক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।

ফলে ছোট নৌকায় আগমন কমে যাওয়া বার্নহ্যাম সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা হলেও, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে মানবপাচারকারী চক্রকে কতটা কার্যকরভাবে ভেঙে দেওয়া, আশ্রয় আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং যাদের থাকার অধিকার নেই তাদের প্রত্যাবাসন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।

সূত্রঃ অ্যান্ডি বার্নহ্যামের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ

এম.কে

Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ভিসা হারানোর ভয় নেই! নির্যাতনকারী নিয়োগকর্তা ছেড়ে নতুন চাকরির সুযোগ স্কিলড ওয়ার্কারদের

যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্ব ও কর্মক্ষেত্রে শোষণের শিকার অভিবাসী কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে হোম অফিস। স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় থাকা এবং আধুনিক দাসত্বের স্বীকৃত ভুক্তভোগীরা এখন তাদের শোষণকারী নিয়োগকর্তার চাকরি ছেড়ে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন, শুধু চাকরি পরিবর্তনের কারণে তাদের অভিবাসন-স্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়বে না। হোম অফিস আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় বিষয়টি তুলে ধরেছে।

হোম অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, “আধুনিক দাসত্বের কোনো ভুক্তভোগীকে তার অভিবাসন-স্থিতির কারণে শোষণকারী নিয়োগকর্তার কাছে আটকে থাকতে হবে না।” নতুন ব্যবস্থায় স্বীকৃত ভুক্তভোগীদের জন্য বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার মেয়াদ চলাকালীন অন্য নিয়োগকর্তার কাছে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

এর আগে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল নির্দিষ্ট স্পনসর ও নির্দিষ্ট চাকরির সঙ্গে কর্মীর অভিবাসন-অনুমতির সম্পর্ক। সাধারণ নিয়মে ভিসাধারী ব্যক্তি তার স্পনসর করা চাকরির বাইরে অন্য চাকরি করতে পারেন না। ফলে কোনো কর্মী যদি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে গুরুতর শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম কিংবা আধুনিক দাসত্বের শিকার হতেন, তাহলে চাকরি ছেড়ে দিলে ভিসা হারানোর আশঙ্কা তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারত। নতুন পরিবর্তনটি এই ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই আনা হয়েছে।

নতুন নিয়মে কারা সুবিধা পাবেন?

এই সুবিধা সব স্কিলড ওয়ার্কার ভিসাধারীর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়। হোম অফিসের Competent Authority-এর মাধ্যমে যেসব কর্মীকে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে identified করা হয়েছে, মূলত তারাই নতুন বিধানের আওতায় পড়বেন।

হোম অফিসের ব্যাখ্যায়, এ ধরনের কর্মীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার বাকি সময়ের জন্য নির্দিষ্ট স্পনসরের সঙ্গে কাজ করার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ তারা অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের অধিকার পেয়ে যাবেন। তাদের বর্তমান অভিবাসন-অনুমতির মেয়াদ ও অন্যান্য প্রযোজ্য অভিবাসন শর্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?

অভিবাসন-স্থিতির সঙ্গে চাকরির সম্পর্ক অনেক সময় বিদেশি কর্মীদের নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তোলে। যুক্তরাজ্যের Migration Advisory Committee-ও অতীতে উল্লেখ করেছে যে অভিবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কের কারণে অভিবাসী কর্মীরা বিভিন্ন ধরনের শোষণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, বাজারদরের তুলনায় বেশি আবাসন খরচ এবং অন্যান্য শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ও রয়েছে।

আধুনিক দাসত্বের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। হোম অফিসের সাম্প্রতিক স্ট্যাটিউটরি গাইডেন্সে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমের ক্ষেত্রে শারীরিক সহিংসতা ছাড়াও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বা পুলিশের কাছে কর্মীকে রিপোর্ট করার হুমকি এক ধরনের ‘penalty’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এমনকি কোনো ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে কাজ করতে সম্মত হলেও যদি তার কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প না থাকে, তাহলে পরিস্থিতিটি forced labour-এর আওতায় পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্বের চিত্র কতটা বড়?

হোম অফিসের সর্বশেষ পূর্ণ-বছরের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে ২৩,৪১১ জন সম্ভাব্য আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগীকে National Referral Mechanism (NRM)-এ রেফার করা হয়। এটি ২০২৪ সালের ১৯,১১৭ জনের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি এবং ২০০৯ সালে NRM চালুর পর সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা।

২০২৫ সালের রেফারেলগুলোর মধ্যে ৭৭ শতাংশ বা ১৭,৯৯৯টি কেস Single Competent Authority-এর কাছে পাঠানো হয় এবং ২৩ শতাংশ বা ৫,৪১২টি কেস Immigration Enforcement Competent Authority-এর কাছে পাঠানো হয়। সবচেয়ে বেশি রেফার হওয়া জাতীয়তার মধ্যে ছিল যুক্তরাজ্যের নাগরিক, ইরিত্রিয়ার নাগরিক এবং ভিয়েতনামের নাগরিক।

২০২৬ সালেও প্রবণতাটি অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আরও ৬,০০৩ জন সম্ভাব্য ভুক্তভোগী হোম অফিসে রেফার করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।

বিশেষ করে বিদেশি কর্মীদের জন্য কেন বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ?

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সঙ্গে আধুনিক দাসত্ব ও শ্রমিক শোষণের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারি নির্দেশিকাতেও বিদেশি কর্মীদের আধুনিক দাসত্বের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা ও রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

নতুন বিধানের ফলে কোনো স্বীকৃত ভুক্তভোগীকে শুধু ভিসা হারানোর ভয়েই শোষণকারী নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ চালিয়ে যেতে হবে না—এটাই পরিবর্তনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে ‘স্বীকৃত ভুক্তভোগী’ হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। শুধু নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই নতুন সুবিধাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে Home Office-এর নির্ধারিত Competent Authority-এর মাধ্যমে শনাক্ত হতে হবে।

যুক্তরাজ্যের NRM ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিষয়ে প্রথমে একটি reasonable grounds এবং পরবর্তী পর্যায়ে conclusive grounds সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো রয়েছে। হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা মামলার একটি ব্যাকলগ রয়েছে এবং সরকার ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেই ব্যাকলগ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

অভিবাসী কর্মীদের জন্য বড় বার্তা

সামগ্রিকভাবে, নতুন পরিবর্তনটি স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সুরক্ষা যোগ করছে। কারণ একজন কর্মী যদি জানেন যে শোষণকারী নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি হারানোর পাশাপাশি তার ভিসাও বিপদে পড়তে পারে, তাহলে তিনি নির্যাতন বা শোষণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাতে ভয় পেতে পারেন।

নতুন নিয়মের লক্ষ্য হলো সেই ভয় কমানো—আধুনিক দাসত্বের স্বীকৃত ভুক্তভোগী যেন অভিবাসন-স্থিতির কারণে শোষণকারী নিয়োগকর্তার কাছে বন্দি হয়ে না থাকেন।

তবে কর্মীদের মনে রাখা প্রয়োজন, এটি সব ধরনের কর্মক্ষেত্রের বিরোধ বা সাধারণ চাকরির সমস্যা সমাধানের কোনো সাধারণ ছাড় নয়। নতুন সুরক্ষা মূলত হোম অফিসের মাধ্যমে আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত হওয়া স্কিলড ওয়ার্কারদের জন্য প্রযোজ্য।

সূত্র: যুক্তরাজ্যের হোম অফিস, GOV.UK ও National Referral Mechanism-এর সরকারি পরিসংখ্যান।

এম.কে